পাহাড়ের গহিনে যমদূত

কক্সবাজারের টেকনাফে পাহাড়ে পাচারকারীদের আস্তানা যেন সাক্ষাৎ যমদূত। বৃহস্পতিবার বিকালে অভিযানে গিয়ে পাচারকারীদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন এক সেনাসদস্য। আর আগেও পাহাড়ে গোলাগুলিতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরের ১ এপ্রিলও টেকনাফের গহিন পাহাড় থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ ও স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য মতে, নিহত তিনজন চিহ্নিত ডাকাত ও মানব পাচারকারী চক্রের সদস্য। অপহরণ ও মানব পাচারকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছিল পুলিশ। গত বছর টেকনাফে পাচারকারীদের আস্তানা থেকে পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে রামুর করিম উদ্দিন নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। পাহাড়ে এসব অপরাধী বেপরোয়া ওঠার কারণে টেকনাফের হ্নীলা ও নোয়াখালী পাড়ায় সম্প্রতি সেনাক্যাম্প স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। স্থানীয়রা এ ঘোষণা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।

সরেজমিন স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গহিন পাহাড়ে এ চক্রের আস্তানা উপড়ে দিতে না পারলে মানব পাচার ও অপরাধ রোধ করা সম্ভব নয়। এদিকে হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গিখালীর দুর্গম পাহাড়ে সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের আস্তানা থেকে উদ্ধার ৫৬ জিম্মিকে গতকাল টেকনাফ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। অন্যদিকে নিহত সেনাসদস্যের লাশ ফরিদপুরে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।

এদিকে পাহাড়ে মানব পাচারকারীদের গুলিতে সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। মানব পাচারকারীদের আস্তানা নির্মূলে পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযানের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরা। এ ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল জুমার নামাজের পর টেকনাফের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন করা হয়েছে। আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের গুলিতে সেনাসদস্য সৈনিক মো. তিতাস শেখ (২৭) নিহত হন। অভিযানে মানব পাচারকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়েছে। এ সময় একটি পিস্তল, একটি দেশি তৈরি বন্দুক ও চার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, পাহাড়ে অবস্থানরত সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। অপরাধ করে কারও পার পাওয়ার সুযোগ নেই।

মিথ্যা প্রলোভনে পাচার : বৃহস্পতিবার উদ্ধার ফরিদপুরের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আট দিন ধরে মানব পাচারকারীরা পাহাড়ের একটি ঝুপড়ি ঘরে বন্দি করে রেখেছিল। পালানোর চেষ্টা করেও পারিনি। সেখানে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি সশস্ত্র পাহারাদল ছিল।

আসাদুজ্জামান জানান, কক্সবাজারের একটি ব্রিজে চাকরির সুবাদে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের রোহিঙ্গা ইমামুলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে তাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে ক্যাম্পে কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আট দিন আগে তাকে ডেকে নেওয়া হয়। কেড়ে নেওয়া হয় মোবাইল ফোনসহ সঙ্গে থাকা সবকিছু। পরে রাতে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তাকে পাহাড়ে নিয়ে মানব পাচারকারীদের হাতে তুলে দেয়।

আসাদুজ্জামানের ভাষ্য, পাহাড়ে গিয়ে তিনি দেখতে পান, তার মতো আরও অর্ধশতাধিক মানুষকে আটকে রাখা হয়েছে। তখনই বুঝতে পারেন, তিনি মানব পাচারকারী চক্রের ফাঁদে পড়েছেন। ‘দুই দিন আগে শতাধিক নৌকাসহ একটি ট্রলার সাগরপথে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আমাকে আরও পাঁচজনের সঙ্গে সেখানে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু জায়গা না থাকায় সেদিন ট্রলারে তোলা হয়নি। সর্বশেষ গতকাল আমাদের পাচারের পরিকল্পনা ছিল। যৌথবাহিনী অভিযানে না গেলে আমরা পাচার হয়ে যেতাম।

টাকার বিনিময়ে হাত বদল : পাহাড় থেকে উদ্ধার হওয়া উখিয়ার ছেপটখালীর বাসিন্দা মো. সাইফুল ও মিজানুর রহমান সাগর বলেন, ‘কাজ দেওয়ার কথা বলে নূরআলী নামে এক দালাল আমাদের মানব পাচারকারীদের হাতে তুলে দেয়। পরে পাচারকারীদের কাছ থেকেই জানতে পারি, তারা আমাদের দুজনকে ১ লাখ টাকায় কিনেছে। পাঁচ দিন ধরে দেখেছি, প্রতিদিন চার-পাঁচজন করে নতুন মানুষ এনে সেখানে জড়ো করা হতো। কেউ কথা বলতে চাইলে তাঁকে ব্যাপক মারধর করা হতো। আমরাও পালানোর চেষ্টা করায় মারধরের শিকার হয়েছি। পরে আমাদের লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।’ তারা আরও বলেন, ‘দিনে মাত্র দুই বেলা খাবার হিসেবে দেওয়া হতো কাঁচা কদু আর ডাল। ক্ষুধায় প্রাণ যায় যায় অবস্থা।’

এসআরবি-১৫ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল খন্দকার মো. মাহমুদুর রহমান বলেন, টেকনাফের পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র অপহরণ ও মানব পাচার চক্র সক্রিয় রয়েছে। তাদের ভয়ে ওই এলাকার মানুষ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এর আগেও যৌথবাহিনী অভিযান চালিয়ে তাদের আস্তানা ধ্বংস করেছে।

অভিযানে তিন সেনাসদস্য নিহত : কক্সবাজারে ডাকাতি, মাদক, সন্ত্রাস ও মানব পাচারবিরোধী অভিযানে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সদস্য। ডুলাহাজারায় ডাকাত দলের বিরুদ্ধে অভিযানে লেফটেন্যান্ট তানজীম ছারোয়ার, মাদকবিরোধী অভিযানে স্কোয়াড্রন লিডার রেজোয়ান রুশদী এবং সর্বশেষ মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযানে শহীদ হয়েছেন সেনাসদস্য তিতাস শেখ।

টেকনাফের গহিন পাহাড়ে তিনজনের লাশ : কক্সবাজারের টেকনাফের গহিন পাহাড়ে তিনজনের লাশ পড়ে থাকার খবর পাওয়া গেছে। লাশ উদ্ধারে চেষ্টা চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সেনাসদস্য নিহতের ঘটনার পর পাহাড়ে যৌথ বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গতকাল বিকালে হ্নীলা ইউনিয়নের নয়াপাড়া ও লেদা ক্যাম্পের পূর্বে পাহাড়ে লাশের সন্ধান পায় পুলিশ।

কক্সবাজারের জেলা পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, লাশগুলো উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

বৃহস্পতিবার বিকালে ওই পাহাড়ে সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের আস্তানায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে মানব পাচারকারীদের গুলিতে সেনাসদস্য মো. তিতাস শেখ (২৭) নিহত হন। এ সময় যৌথ বাহিনী ৫৬ জনকে উদ্ধার এবং মানব পাচারকারী চক্রের ছয় সদস্যকে আটক করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights