পোশাকশিল্পে অস্থিরতা, উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা

অনলাইন ডেস্ক
বেতন বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিক আন্দোলন, কারখানায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও সড়ক অবরোধে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে দেশের তৈরি পোশাকশিল্প। কারখানা চালু রাখা তো দূরের কথা, উৎপাদনযন্ত্র ও স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা।

তাদের মতে, এ অস্থিরতা শুধু উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত করছে না, দেশের অর্থনীতিকেও নতুন সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

তাদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা ও বাংলাদেশের রপ্তানি আদেশ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে কেন্দ্র করে প্রায় এক মাস ধরে অস্থিরতা চলছে। গত এক সপ্তাহে পরিস্থিতি সহিংস রূপ নিয়েছে।

এ বিষয়ে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক ও নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি এমনিতেই ভালো নয়। উদ্যোক্তাদের মুনাফা কমে যাচ্ছে। মজুরি বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে তাদের নানা সমস্যার মোকাবিলা করতে হচ্ছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার, ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা না পাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মন্দার কারণে শিল্পের ওপর চাপ বাড়ছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের দামও ১৬ শতাংশ বেড়েছে। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও উদ্যোক্তারা শ্রমিকদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ব্যবসা পরিচালনার চেষ্টা করছেন।

বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারের উদ্যোগ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে ফজলুল হক বলেন, আন্দোলনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বাইরে অন্য কোনো শক্তি বা তৃতীয় কিংবা চতুর্থ পক্ষ ইন্ধন জোগাচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সক্রিয় হয়ে সহিংসতার পেছনে অন্য কেউ জড়িত আছে কি না, তা বের করতে হবে।

মজুরি বোর্ড গঠনের পর আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। ফজলুল হক বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের নির্ধারিত প্রক্রিয়া রয়েছে। সেই সময়সূচি অনুযায়ী জানুয়ারিতে মজুরি নির্ধারণের কথা ছিল। এরই মধ্যে সরকার দ্রুততম সময়ে বোর্ড গঠন করেছে। সেখানে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধি, সরকার এবং নিরপেক্ষ প্রতিনিধি রয়েছেন। ঐতিহাসিকভাবেই এ ধরনের সমন্বয়ের মাধ্যমে মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়। তাই বোর্ডকে আগে কাজ করার সুযোগ দেওয়া উচিত।

তিনি বলেন, শ্রমিকদের যেমন মজুরি বৃদ্ধির দাবি রয়েছে, তেমনি মালিকদেরও শিল্প পরিচালনার সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। সব দিক পর্যালোচনা করে মজুরি বোর্ড একটি প্রস্তাব দেবে। এরপর সেটি নিয়ে আলোচনা ও সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে। বোর্ডের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর কারও আপত্তি থাকলেও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব। কিন্তু তার আগেই ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এসব ঘটনায় শ্রমিক, মালিক কিংবা দেশের কারও লাভ হচ্ছে না; বরং সবারই ক্ষতি হচ্ছে।

অন্যদিকে, তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের পরও চলমান আন্দোলনের কোনো যৌক্তিক ভিত্তি দেখছেন না তিনি। পরিস্থিতিতে পোশাকশিল্পের মালিকেরা অসহায় হয়ে পড়েছেন। যেসব কারখানায় কখনো শ্রমিক অসন্তোষ হয়নি কিংবা বেতন পরিশোধে সমস্যা ছিল না, সেসব কারখানাতেও বাইরে থেকে লোকজন এসে শ্রমিকদের উসকানি দিয়ে বের করে নিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, কারখানায় ভাঙচুরের পাশাপাশি রাস্তায় গাড়ি ও বাসে হামলা চালানো হচ্ছে। যেসব কারখানায় বেতন-ভাতা নিয়ে কোনো সমস্যা ছিল না, অতীতে সব ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং শ্রমিকদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, সেসব কারখানাও ভাঙচুর করা হচ্ছে। অনেক কারখানায় ককটেল পাওয়া গেছে, কোথাও নিক্ষেপ করা হয়েছে, আবার কোথাও আগুন দেওয়া হয়েছে। এগুলো কোনোভাবেই শ্রমিক আন্দোলনের কাজ হতে পারে না; বরং দুষ্কৃতকারীদের কর্মকাণ্ড।

শোভন ইসলাম বলেন, শ্রমিক ফেডারেশনগুলোর নেতারা শ্রমমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন এবং সেখানে ইতিবাচক বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে শ্রমিকদের ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। পরিস্থিতি যত এগোচ্ছে, পোশাকশিল্পের মালিকেরা তত বেশি অসহায় বোধ করছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। বিজিবি মোতায়েনও ধীরে ধীরে হচ্ছে। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না।

তিনি বলেন, গত এক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি, বৈশ্বিক নানা সংকট, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, গ্যাসের দাম বৃদ্ধি এবং গ্যাসের অপর্যাপ্ততার কারণে পোশাকশিল্প চাপে রয়েছে। সম্প্রতি প্রায় এক সপ্তাহ ধরে তেল ও গ্যাসের সংকটের মধ্যেও উদ্যোক্তারা কারখানা চালু রাখার চেষ্টা করেছেন। এর মধ্যে নতুন করে সহিংসতা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটায় বিদেশি ক্রেতাদের কাছে শিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ক্রেতাদের কাছে এখন আর পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার মতো অবস্থাও থাকছে না। ক্রেতারা উৎপাদন ও সরবরাহের নিশ্চয়তা চান। বাংলাদেশে অস্থিরতা চলতে থাকলে তারা অন্য দেশে কিছুটা বেশি দাম দিয়েও পোশাক তৈরি করাতে পারেন। এতে বাংলাদেশের রপ্তানি আদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights