বিদেশে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়
স্বর্ণ ও হীরা কেনাবেচার আড়ালে ৬৭৮ কোটি ১৯ লাখ টাকার চোরাচালান ও অর্থ পাচারের অভিযোগে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে এক দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গতকাল ঢাকার মহানগর হাকিম মো. আরিফুল ইসলাম তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে এ আদেশ দেন। সিআইডি সূত্র জানায়, ২০০৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের বৈধ আমদানির তুলনায় স্থানীয় বাজার থেকে কেনা স্বর্ণ ও হীরার পরিমাণ এত বেশি হলো কীভাবে? এসব মূল্যবান পণ্যের উৎস, সরবরাহকারী এবং কেনাবেচার বৈধ নথি কোথায়? এই লেনদেনের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ কোথায় গেছে, সেসব জানতে তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দিলীপ আগরওয়ালার বিরুদ্ধে বিদেশ থেকে স্বর্ণ ও হীরা আনার নামে অর্থ পাচার, দুবাই ও সিঙ্গাপুরে স্বর্ণ চোরাচালান চক্র নিয়ন্ত্রণ এবং বিদেশে সম্পদ গড়ার অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করে সিআইডি। ভারতের কলকাতায় তিনটি জুয়েলারি দোকান এবং মালয়েশিয়া, দুবাই ও কানাডায় সম্পদের অভিযোগ রয়েছে আগরওয়ালার বিরুদ্ধে। সিআইডির অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টরা জানান, পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার, মানিকগঞ্জের সিংগাইর ও ঝিনাইদহকে ঘিরে স্বর্ণের ব্যবসার আড়ালে হুন্ডির মাধ্যমে কী পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়েছে, কিংবা সিঙ্গাপুর ও ভারতে সম্পদের উৎস কী? এসব প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর পেতে সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি, ব্যাংক লেনদেন ও সম্পদের মালিকানা যাচাইয়ে আগরওয়ালাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি। এদিকে সিআইডির মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ২০০৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড বিদেশ থেকে ঋণপত্রের (এলসি) মাধ্যমে বৈধভাবে স্বর্ণবার, স্বর্ণালংকার, হীরা ও সংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানি করেছে ৩৮ কোটি ৪৭ লাখ ৪৮ হাজার ১১ টাকা ৫২ পয়সার। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় বাজার থেকে ৬৭৮ কোটি ১৯ লাখ ১৪ হাজার ১৪ টাকা মূল্যের স্বর্ণ ও হীরা কেনা, বিনিময় বা রূপান্তর করেছে। অর্থাৎ নথিতে দেখানো বৈধ আমদানির তুলনায় স্থানীয় বাজারের লেনদেনের অঙ্ক ১৭ গুণেরও বেশি। স্থানীয় বাজার থেকে কেনা এসব পণ্যের উৎস ও সরবরাহকারীদের বিষয়ে সন্তোষজনক বৈধ নথি দেখাতে পারেনি ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড। সিআইডির কর্মকর্তারা বলছেন, ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড ও ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড লিমিটেডকে ব্যবহার করে চোরাচালানের মাধ্যমে সংগ্রহ করা স্বর্ণ ও হীরা কেনাবেচা করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে অর্থ উপার্জন ও পাচারের ঘটনা ঘটেছে। তবে স্থানীয় বাজার থেকে কেনা পুরো পরিমাণ পণ্যই চোরাচালানের মাধ্যমে এসেছে কি না, তা নির্ধারণে সরবরাহকারী, ক্রয়-বিক্রির হিসাব ও অর্থের প্রবাহ যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব কোনো তথ্যই দিলীপ আগরওয়ালার কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। দিলীপ আগরওয়ালার বিরুদ্ধে বিদেশে সম্পদ অর্জন এবং আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নতুন নয়। তিনি দুবাই ও সিঙ্গাপুরে চোরাচালান চক্র নিয়ন্ত্রণ, কলকাতায় তিনটি জুয়েলারি দোকান এবং মালয়েশিয়া, দুবাই ও কানাডায় সম্পদ থাকার তথ্যও পেয়েছে সিআইডি। সূত্র জানায়, দিলীপ আগরওয়ালার স্বর্ণের চোরাচালান ও হুন্ডির মধ্যে আর্থিক যোগসূত্রও রয়েছে। তার বেশির ভাগ স্বর্ণের মূল্য পরিশোধ ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে অর্থ লেনদেন হয়েছে। এই অর্থ সংগ্রহকারী অনেক ব্যক্তির একটি তালিকা পেয়েছে তদন্তকারীরা। তাদের সন্দেহ আগরওয়ালার মাধ্যমে তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করেছে। সেসব পাচারের তথ্য বের করতে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং পুলিশ সদরদপ্তর যৌথ একটি কমিটিও করেছে। এ ছাড়াও তাঁতীবাজার, মানিকগঞ্জের সিংগাইর ও ঝিনাইদহে স্বর্ণ ব্যবসায়ী, সরবরাহকারী এবং অর্থ লেনদেনে জড়িত ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ করেছে সিআইডি। তাদের কার কী ভূমিকা ছিল তা যাচাই করে দেখা হচ্ছে। এদিকে আদালত সূত্র জানায়, অর্থ পাচার সংক্রান্ত এবং বিদেশে বিপুল সম্পদ গড়ার নেপথ্য কী, এমন নানা প্রশ্নের উত্তর জানতে সিআইডির মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আশরাফুল হাসান দিলীপ আগরওয়ালাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। এ সময় তদন্তের স্বার্থে মামলাসংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, মানি লন্ডারিংয়ের সত্যতা নিরূপণ এবং সংশ্লিষ্ট লেনদেনের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। শুনানি শেষে আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানী থেকে দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে হওয়া হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। পরে জামিন পাওয়ার পর গত বছরের ১ অক্টোবর কারাগার থেকে মুক্তি পান।
