মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির জোয়ার : হাউসে ২৩৭, সিনেটে ৫৪ আসন

অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ও পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে দেশটির সাধারণ ভোটাররা। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পূর্বাভাস থাকলেও শেষ পর্যন্ত মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট এবং নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদউভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টি।

জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়, মুদ্রাস্ফীতি এবং ইরানের সঙ্গে অনভিপ্রেত যুদ্ধের জেরে সৃষ্ট ক্ষোভের ফলে ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটিগুলোতেও বড় ধস নেমেছে।

প্রতিনিধি পরিষদে মোট আসন ৪৩৫টি। প্রাপ্ত ফল অনুযায়ী প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাট ২৩৭, রিপাবলিকান ১৩৯, সিনেটে ডেমোক্র্যাট ৫৪, রিপাবলিকান ৪৪ আসন পেয়েছে। ৫৯ আসনের ফল পাওয়া যায়নি।

অর্থাৎ এটা নির্বাচনের আংশিক ফল। সিনেটে মোট আসন ১০০টি। ডেমোক্র্যাটরা ৫৪ এবং রিপাবলিকানরা ৪৪ আসনে জয় পেয়েছে। দুটি আসনের হিসাব বাকি রয়েছে।

এই নির্বাচনে নির্বাচিত করেছেন ৩৬টি রাজ্যের ভোটাররা গভর্নরও। এদিকে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ইরান যুদ্ধকে দায়ী করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের হারের কারণ হলো যুদ্ধ। প্রেসিডেন্ট নিজেই গত রাতে এ কথা বলেছেন।

কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিরঙ্কুশ জয় : হাতির ঝাণ্ডা উড়িয়ে সিনেটে আধিপত্য বজায় রাখলেও এবার বড় ব্যবধানে হেরে গেছে রিপাবলিকানরা।

ডেমোক্র্যাটরা প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেরিয়ে বহু আসনে জয় নিশ্চিত করেছে। আবার প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের মধ্যে ডেমোক্র্যাটরা সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে আইনসভার ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। নির্বাচনী এই ঢেউয়ে রিপাবলিকানদের ঐতিহ্যবাহী ও শক্তিশালী দুর্গগুলোতেও বড় বিপর্যয় ঘটেছে। কানসাস ও টেক্সাসের মতো অঙ্গরাজ্যগুলোতে বহু দশকের খরা কাটিয়ে ডেমোক্র্যাটরা ঐতিহাসিক জয় তুলে নিয়েছে। এ ছাড়া জর্জিয়ায় কিশা ল্যান্স বটমস যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হিসেবে নির্বাচিত হয়ে এক নতুন রেকর্ড গড়েন। বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৭০ শতাংশ ভোটারই চেয়েছেন কংগ্রেসে প্রেসিডেন্টের একচ্ছত্র ক্ষমতার ওপর যেন কঠোর চেক ও ব্যালান্স বা নজরদারি বজায় থাকে।

ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া : নির্বাচনের এই বিপর্যয়কর ফলাফলের মুখে প্রাথমিক পর্যায়ে তীব্র হতাশা প্রকাশ করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফলাফল প্রকাশের সময় রক্ষণশীল গণমাধ্যম ফক্স নিউজের কভারেজ ও এক্সিট পোল নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ঝাড়েন তিনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন যে তিনি সরাসরি ব্যালট পেপারে না থাকায় রিপাবলিকানদের এই খেসারত দিতে হয়েছে। তবে সব বিতর্ক ও প্রাথমিক উত্তেজনার পর ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী ফলাফল মেনে নেন। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ডেমোক্র্যাটদের এই জয়ে তাদের অভিনন্দন জানান এবং অভিবাসনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইস্যুতে বিরোধী দলের সঙ্গে একত্রে কাজ করার সদিচ্ছা প্রকাশ করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হোয়াইট হাউসের বাইরে কংগ্রেসের দুই কক্ষেই ডেমোক্র্যাটদের এই নিয়ন্ত্রণ আসায় ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছরে নীতি প্রণয়ন ও আইন পাস করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হতে যাচ্ছে। নিউইয়র্ক টাইমসের সঙ্গে এই সংক্ষিপ্ত ফোনালাপে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বেশ নিষ্প্রভ শোনাচ্ছিল। দেশজুড়ে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের খবরগুলো তখন তিনি শুধুই আত্মস্থ করছিলেন।

তবে রিপাবলিকানদের পরাজয় সত্ত্বেও নিজের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরের কোনো কিছু নিয়েই তার বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই বলে জোর দিয়ে জানান তিনি। ট্রাম্প বলেন, যেকোনো প্রেসিডেন্টের ইতিহাসে এই সময়টিকে আমি সবচেয়ে সফল দুই বছর বলে মনে করি।

মঙ্গলবার রাতে হোয়াইট হাউসের ইস্ট রুমে শীর্ষ কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে একসঙ্গে বসে নির্বাচনের ফলাফল দেখার পর প্রেসিডেন্ট এই মন্তব্যগুলো করেন। সেখানে তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ ও বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক। উপস্থিত কেউ কেউ সেখানকার পরিবেশকে ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন’ ও ‘শোকাবহ’ বলে বর্ণনা করেছেন। সন্ধ্যাজুড়ে ট্রাম্প তার রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একান্ত এই কথোপকথনের বিষয়ে অবগত ব্যক্তিরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নির্বাচনের আগে জনমত জরিপ সম্পর্কে তাকে ভুল তথ্য দেওয়ার জন্য উপদেষ্টাদের অভিযুক্ত করেন ট্রাম্প।

এদিকে, নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্তের জন্য তিনি অনুতপ্ত নন এবং সুযোগ পেলে ‘আবারও তা-ই’ করবেন। তবে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে ভোটাররা যে অসন্তুষ্ট ছিলেন, সেটি তিনি স্বীকার করেছেন। ট্রাম্প বলেন, ইরান ইস্যুতে তাদের আপত্তি নেই, কিন্তু তারা সম্ভবত তেলের দাম নিয়ে খুশি ছিল না। আসলে এমনটা হতেই পারে। কিন্তু ওই সিদ্ধান্তের জন্য আমার বিন্দুমাত্র আফসোস নেই। বস্তুত দেশ ও বিশ্বের ভবিষ্যতের জন্য এটি ছিল অত্যন্ত বিচক্ষণ একটি সিদ্ধান্ত।

ট্রাম্প দাবি করেন, একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে কথা বলতে ডেমোক্র্যাটরা ইতোমধ্যে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তবে তিনি কারো নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তিনি মনে করেন, সরকারের ঋণসীমা নির্ধারণের বিষয়ে তাঁরা একসঙ্গে কাজ করতে পারবেন। তিনি বলেন, আমার হাতে পূর্ণ ভেটো ক্ষমতা রয়েছে, তাই আমাদের কাছে তাদের আসতেই হবে। আর তাদের কাছে যদি ভালো কোনো প্রস্তাব থাকে, তবে একসঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে আমি অবশ্যই উদার।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হবো : যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা ওপর বিরক্ত হয়ে পড়লে ইসরায়েলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেশটিতে নিজের জনপ্রিয়তা ৯৯ শতাংশ বলেও দাবি করেছেন তিনি। কানাডার সংবাদমাধ্যম ইয়াহু লাইফস্টাইলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রসিকতার ছলে এসব কথা বলেন ট্রাম্প।

সাক্ষাৎকারে ৮০ বছর বয়সী মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ইসরায়েলে তার জনপ্রিয়তা এতটাই বেশি যে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ তাঁর ওপর বিরক্ত হয়ে গেলে তিনি সেখানে চলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। একই সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলকে দেওয়া মার্কিন আর্থিক সহায়তা বন্ধের বিষয়েও কথা বলেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এ বিষয়ে একটি সমঝোতা হয়েছে। সেই অনুযায়ী চলতি বছরের শেষ নাগাদ ইসরায়েলকে বছরে ৪০০ কোটি ডলারের সহায়তা দেওয়া বন্ধ করবে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পের ভাষ্য, ইসরায়েলের এখন আর এই অর্থের প্রয়োজন নেই।

সূত্র : সিএনএন, নিউইয়র্ক টাইমস, রয়টার্স, এপি, বিবিসি ও সিবিএস নিউজ, বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights