যুক্তরাষ্ট্রে শক্তিশালী হারিকেনের আঘাত, বিদ্যুৎহীন ৬ লাখের বেশি গ্রাহক
অনলাইন ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূলে আঘাত হানার পর দুর্বল হয়ে পড়েছে হারিকেন ইসাইয়াস। ঝড়টি দক্ষিণ আলাবামার ওপর দিয়ে অগ্রসর হওয়ার সময় গতি ও শক্তি হারিয়ে ক্রান্তীয়-পরবর্তী ঝড়ে রূপ নিয়েছে। তবে এর প্রভাবে অভ্যন্তরীণ এলাকাগুলোতে আকস্মিক বন্যা, প্রবল বাতাস ও বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হারিকেন সেন্টার (এনএইচসি) শনিবার জানিয়েছে, ইসাইয়াসের অবস্থান ছিল আলাবামার মন্টগোমেরি শহরের প্রায় ৮৯ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ-পশ্চিমে। তখন ঝড়টির সর্বোচ্চ একটানা বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার।
এর আগে আটলান্টিক মৌসুমের প্রথম হারিকেন হিসেবে ফ্লোরিডার ডেস্টিনের কাছে উপকূলে আঘাত হানার সময় ইসাইয়াসের সর্বোচ্চ একটানা বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৬৯ কিলোমিটার।
ফ্লোরিডা ও আলাবামায় বন্যা, উপড়ে পড়েছে গাছপালা
ঝড়ের প্রভাবে ফ্লোরিডার ডেস্টিন শহরের বিভিন্ন সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। কাছের পেনসাকোলা শহরে সড়কের ওপর গাছপালা ও বিভিন্ন ধরনের ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ায় বাসিন্দাদের রাস্তায় বের না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে পুলিশ।
ঝড়ের কারণে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপড়ে পড়া গাছ ও বিদ্যুতের খুঁটির ছবি প্রকাশ করেছেন। পেনসাকোলার একটি সরাইখানার ছাদ প্রবল বাতাসে উড়ে যাওয়ার ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে ওঠায় ফ্লোরিডার পানহ্যান্ডল অঞ্চলের কয়েকটি কাউন্টিতে শুক্রবার রাতে সাময়িকভাবে জরুরি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।
দক্ষিণ আলাবামার বিভিন্ন এলাকাও প্লাবিত হয়েছে। অঙ্গরাজ্যটির মোবাইল শহরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঝড়ে গাছপালা ও বিদ্যুতের লাইন উপড়ে পড়েছে। একই ধরনের পরিস্থিতির কারণে অঙ্গরাজ্যের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত হিউস্টন কাউন্টির কয়েকটি সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের চিত্রও উদ্বেগজনক। বিদ্যুৎ বিভ্রাট পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট পাওয়ারআউটেজ ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার ভোরে ফ্লোরিডা ও আলাবামায় ৬ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি গ্রাহক বিদ্যুৎবিহীন ছিলেন।
উপকূলে জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা
ইসাইয়াসের কারণে উপকূলীয় এলাকায় জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা করছে এনএইচসি। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, আলাবামার ডফিন দ্বীপ থেকে ফ্লোরিডার আউসিলা নদী পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকায় পানির উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ০.৯১ থেকে ১.৫২ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
ঝড়ের কারণে বিমান চলাচলও ব্যাহত হয়েছে। শুক্রবার কয়েকটি বিমানবন্দরে অধিকাংশ ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করা হয়। এর মধ্যে ডেস্টিন-ফোর্ট ওয়ালটন বিচ বিমানবন্দরের সব আগমন ও বহির্গমন ফ্লাইট বন্ধ ছিল।
ঝড়ের প্রস্তুতি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তারা পরিস্থিতির ওপর ঘনিষ্ঠভাবে নজর রাখছেন। হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “আমরা হারিকেনটির ওপর খুব নিবিড়ভাবে নজর রাখছি।” পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রণে রয়েছে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
উদ্ধার তৎপরতায় ফ্লোরিডার পাঁচ হাজার ন্যাশনাল গার্ড সদস্য
ঝড় মোকাবিলায় ফ্লোরিডার ন্যাশনাল গার্ডের প্রায় পাঁচ হাজার সেনা ও বিমানবাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধারকাজ চালাতে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলগুলোকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কিছু কারাগার থেকে বন্দীদেরও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কওয়েন মুলিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, ইসাইয়াস মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকারের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে ফ্লোরিডা ও আলাবামায় জরুরি অবস্থা ঘোষণার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এদিকে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করতে এবং হারিকেনের সম্ভাব্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
মেক্সিকোর দিকে ধেয়ে যাচ্ছে শক্তিশালী হারিকেন সাইমন
যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূলে ইসাইয়াসের প্রভাবের পাশাপাশি মেক্সিকোর দিকে ধেয়ে যাচ্ছে আরেকটি শক্তিশালী ঝড়- হারিকেন সাইমন। শনিবার ভোরে ঝড়টি শক্তি বাড়িয়ে সাফির-সিম্পসন স্কেলে ক্যাটাগরি ৪ হারিকেনে পরিণত হয়েছে।
এনএইচসি জানিয়েছে, সাইমনের সর্বোচ্চ একটানা বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ২২৫ কিলোমিটারে পৌঁছেছে। ঘণ্টায় ২০৯ কিলোমিটার বা তার বেশি গতির বাতাসসহ ঝড়কে সাধারণত বড় ধরনের হারিকেন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সাইমনের প্রভাবে মেক্সিকোর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। বিশেষ করে জালিসকো উপকূল এবং মিচোয়াকান, কোলিমা ও নায়ারিত অঙ্গরাজ্যের কিছু এলাকায় বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পূর্বাভাসকারীরা প্রাণঘাতী আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। এসব এলাকায় ঝড়ের প্রভাবে জনজীবন ও যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
এছাড়া আরেকটি ক্রান্তীয় ঝড় র্যাচেল সপ্তাহান্তে উত্তর মেক্সিকো ও দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রবল বাতাস ও বৃষ্টিপাত ঘটাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
একই সময়ে উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক ঝড় সক্রিয় থাকায় উপকূলীয় এলাকায় বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিধস ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঝুঁকি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে হচ্ছে। সূত্র: আল-জাজিরা
