রিয়াদ বিমানবন্দরে হুতির প্রাণঘাতী হামলার নিন্দায় বিশ্বনেতারা

অনলাইন ডেস্ক

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়েমেনের হুতিদের তৃতীয় দফা হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত ও তিন শতাধিক আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সৌদি আরব। এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশের দু’জন নাগরিকও রয়েছেন।

এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে এটিকে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে দেখা হচ্ছে। হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা নিন্দা জানিয়েছে।

সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবারের হামলায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক, দু’জন বাংলাদেশি এবং যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিসরের একজন করে নাগরিক রয়েছেন।

ইয়েমেনে চলমান সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার মধ্যে এ হামলার ঘটনা ঘটল। দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত হুতিদের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই চলছে। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সহায়তা করতে হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালাচ্ছে সৌদি আরব।

রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার পর আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন দেশ। বেসামরিক স্থাপনায় হামলার নিন্দা জানিয়ে তারা সৌদি আরবের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও সামনে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্র: যুদ্ধের অংশ হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলাটিকে ‘ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেছেন। সৌদি আরবের কার্যত শাসক ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে শিগগিরই কথা বলবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে হুতিদের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অংশ নেবে কি না, তা বিবেচনা করছেন বলে জানান ট্রাম্প।

তিনি বলেন, “আমরা এতে যোগ দিতে পারি। বিষয়টি খতিয়ে দেখব। আমরা মাত্রই সর্বশেষ হামলার খবর পেয়েছি। তাই সিদ্ধান্ত নেব। আমরা খুব দ্রুত পদক্ষেপ নেব।”

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, হুতিদের হামলায় একজন মার্কিন নাগরিক নিহত হয়েছেন। তিনি হামলাকে নিন্দনীয় আখ্যা দিয়ে এ ধরনের আক্রমণ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় রুবিও লেখেন, “আমরা সৌদি আরব ও দেশটির জনগণের পাশে আছি। নিহত ব্যক্তিদের এবং তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি।”

জাতিসংঘ: আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি
ইয়েমেনে জাতিসংঘের বিশেষ দূত হান্স গ্রুন্ডবার্গ সৌদি আরবের বেসামরিক বিমানবন্দরগুলোতে প্রাণঘাতী হামলাকে সংঘাতের ‘গুরুতর বিস্তার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করে, সহিংসতার চক্রকে দীর্ঘায়িত করে এবং ইয়েমেনে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তোলে।

তিনি বলেন, বেসামরিক স্থাপনায় হামলার ফলে উত্তেজনা বাড়ার পাশাপাশি সংঘাত নিরসনের কূটনৈতিক উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

মিসর ও কাতারের নিন্দা
হুতিদের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে মিসরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাদের ভাষায়, এ হামলা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রতি চরম অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ।

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এটি সৌদি আরবের সার্বভৌমত্বের গুরুতর লঙ্ঘন এবং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি। একই সঙ্গে বেসামরিক মানুষের জীবন, বেসামরিক স্থাপনা ও বিমান চলাচলের নিরাপত্তাও এতে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

কাতার সৌদি আরবের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেছে। দেশটির সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভূখণ্ডের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সৌদি আরব যেসব বৈধ পদক্ষেপ নেবে, সেগুলোর প্রতিও সমর্থন জানিয়েছে দোহা।

পাকিস্তান: জঘন্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড
রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার নিন্দা জানিয়েছে পাকিস্তানও। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘটনাটিকে ‘জঘন্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ এবং আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে অভিহিত করেছে।

মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পাকিস্তান সৌদি আরবের পাশে দৃঢ়ভাবে রয়েছে।

সৌদি আরবের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে সক্রিয় করা পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রেক্ষাপটেও পাকিস্তানের এই অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগের মধ্যেই রিয়াদে এ হামলার ঘটনা ঘটল।

জর্ডান: সৌদি আরবের প্রতি পূর্ণ সংহতি
জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের কাছে সমবেদনা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সৌদি আরবের প্রতি তার দেশের পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেছেন।

জর্ডানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হুতিদের হামলাকে ‘বর্বর আগ্রাসন’ হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের ভাষায়, এ ঘটনা বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রকাশ্য লঙ্ঘন।

ওমান: সংযমের আহ্বান
হামলার নিন্দা জানিয়েছে ওমানও। দেশটি বলেছে, এ অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় প্রজ্ঞা ও আত্মসংযমকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

একই সঙ্গে উত্তেজনার পরিধি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে- এমন পদক্ষেপ এড়িয়ে চলার ওপর জোর দিয়েছে ওমান। দেশটির বক্তব্য, সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে দায়িত্বশীল আচরণ এবং সংযম জরুরি।

ফিলিস্তিনের সংহতি
ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সৌদি আরবের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেছে। সৌদি আরবের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং দেশটির নাগরিক ও বাসিন্দাদের সুরক্ষায় নেওয়া সব পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে তারা।

জাপান: বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা গ্রহণযোগ্য নয়
সৌদি আরবে অবস্থিত জাপানের দূতাবাস হুতিদের বারবার চালানো হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। দূতাবাসের বক্তব্য, যেকোনও পরিস্থিতিতেই বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বেসামরিক বিমানবন্দরে হামলা, বিভিন্ন দেশের নাগরিকের প্রাণহানি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য নতুন করে আঞ্চলিক সংঘাত বিস্তারের আশঙ্কা তৈরি করেছে।

ইয়েমেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে লড়াইয়ের পাশাপাশি সৌদি আরবের বিমান অভিযান চলমান রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন হামলা সংঘাতের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিবৃতিতে আপাতত বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা, সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধে সরাসরি যোগ দেবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। সূত্র: আল-জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights