লিবিয়া হয়ে ইতালি নেওয়ার কথা বলে নির্যাতন, মুক্তিপণে লাখ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ
শরীয়তপুর প্রতিনিধি
লিবিয়া হয়ে ইতালি নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আরিফ নামের এক বাংলাদেশি যুবককে মানব পাচারকারী চক্রের হাতে তুলে দিয়ে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন এবং পরিবারের কাছ থেকে ধাপে ধাপে লাখ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগীর দাবি, টাকা আদায়ের জন্য তাঁর ওপর চালানো নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে পরিবারের কাছে পাঠানো হতো।
এ ঘটনায় শরীয়তপুরের মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্য আরিফের বোন মোসাম্মৎ শাবনী।
মামলার নথি অনুযায়ী, বাদী শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার ধানকাঠি ইউনিয়নের বাহেরচর এলাকার বাসিন্দা। মামলায় ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার রামপাশা বটতলা বাজার এলাকার মো. মোজাম্মেল হকসহ অজ্ঞাত আরও দুই-তিনজনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২-এর ৬, ৭, ৮, ৯ ও ১০ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, বাদীর ভাই আরিফ সরদার বৈধ ভিসায় লিবিয়ায় যান। সেখানে কিছুদিন কাজ করার পর ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর মানব পাচারকারী চক্র তাঁকে অপহরণ করে একটি স্থানে আটকে রাখে। এরপর তাঁর ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ওই বছরের ৮ সেপ্টেম্বর চক্রের সদস্যরা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে আরিফকে উদ্ধারের জন্য ৮ লাখ টাকা দাবি করে। আরিফের ওপর নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের সদস্যদের দেখানো হলে তাঁরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। পরে অভিযুক্তদের দেওয়া একটি ব্যাংক হিসাবে ৮ লাখ টাকা পাঠানো হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া মুন্সিগঞ্জ গিয়ে নগদ ১০ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছে।
মামলার নথিতে প্রথম ঘটনার সময় হিসেবে ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টা । দ্বিতীয় ঘটনার সময় হিসেবে একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর রাত ১২টার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, টাকা দেওয়ার পরও আরিফকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। বরং তাঁর ওপর নির্যাতন বাড়িয়ে আরও অর্থ দাবি করা হয়। পরবর্তী সময়ে আরিফকে উদ্ধার করে বাংলাদেশে ফেরত আনার কথা বলে আরও ১০ লাখ টাকা চাওয়া হয়। এমনকি মুন্সিগঞ্জ এলাকায় লোক পাঠিয়ে একটি নির্দিষ্ট কোড নম্বরের মাধ্যমে টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার কথাও মামলার অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
ভুক্তভোগী আরিফ সরদার বলেন, লিবিয়ায় যাওয়ার পর প্রথমদিকে তিনি স্বাভাবিকভাবে কাজ করেছিলাম । পরে মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যরা তাঁকে ইতালি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।
আরিফ বলেন, “আমাকে লিবিয়া থেকে ইতালি নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু পরে তারা আমাকে আটকে রেখে মারধর ও শারীরিক নির্যাতন করত। পরিবারের কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য নির্যাতনের দৃশ্য ভিডিও করে দেশে পাঠানো হতো। টাকা না দিলে আরও নির্যাতনের হুমকি দিত। জীবন বাঁচানোর জন্য পরিবারের সদস্যরা তাদের দাবি অনুযায়ী টাকা দিতে বাধ্য হয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, পাচারকারীদের হাতে বন্দি থাকার পুরো সময়টি তাঁকে আতঙ্কের মধ্যে কাটাতে হয়েছে। ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে এমন পরিস্থিতিতে ফেলা হবে, তা তিনি কল্পনাও করেননি। দেশে ফেরার পর তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
আরিফের বাবা ইমান হোসেন সরদার বলেন, “বিদেশে ভালো কাজ ও উন্নত জীবনের আশায় আরিফ দেশ ছেড়েছিল। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সংঘবদ্ধ চক্র তাকে জিম্মি করে আমাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করেছে। ছেলেকে বাঁচাতে জায়গাজমি ও সম্পত্তি বিক্রি করে আমরা এখন নিঃস্ব। স্থানীয়ভাবে একাধিকবার বসার পরও টাকা ফেরত পাইনি।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তাঁদের দীর্ঘদিন ঘোরানো হয়েছে। উল্টো আসামিপক্ষের লোকজন তাঁদের বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা মামলা করেছে বলেও দাবি করেন তিনি। এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চান আরিফের বাবা।
মামলার বাদী বলেন, যে ব্যক্তির মাধ্যমে তাঁর ভাইকে ইতালি পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, সেই ব্যক্তি পরে আরিফকে মানব পাচারকারী চক্রের হাতে তুলে দিয়েছেন বলে তাঁদের অভিযোগ। ভাইকে উদ্ধার ও দেশে ফিরিয়ে আনার কথা বলে তাঁদের কাছ থেকে অন্তত ১৮ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে এবং এর বাইরেও বিভিন্ন সময়ে আরও অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মামলার আসামি মো. মোজাম্মেল হকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির পাশাপাশি মানব পাচারকারী চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
