৪০০ বছর বাঁচে যে হাঙর, তাকে মেরে ফেলতে চাইছেন জেলেরা

অনলাইন ডেস্ক

গ্রিনল্যান্ডের জেলেদের সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে ধীরগতির হাঙর গ্রিনল্যান্ড শার্কের দ্বন্দ্ব বহুদিনের। মাছ ধরার সময় জেলেদের জালে ও বড়শিতে আটকে যায় এই বিশাল হাঙর। এতে ছিঁড়ে যায় মাছ ধরার সরঞ্জাম, বাড়ে খরচ। এ কারণে হাঙর নিধনের দাবি তুলেছেন দেশটির কিছু জেলে। তবে প্রাণী সংরক্ষণবিদদের আশঙ্কা, এমন উদ্যোগ এই বিরল প্রজাতির জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

গ্রিনল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলের ২৭ বছর বয়সী জেলে হেনরিক জেনসেন এক দশক ধরে ইলুলিসাট এলাকায় হ্যালিবাট মাছ ধরছেন। তাঁর দাবি, মাছ ধরার সময় গ্রিনল্যান্ড শার্ক প্রায়ই বড়শি ও দড়িতে আটকে যায়।

জেনসেন বলেন, দুর্ঘটনাবশত কোনো হাঙর ধরা পড়লে তিনি সেটি তাঁর কুকুরদের খেতে দেন। কারণ, হাঙরগুলো তাঁর মাছ ধরার দড়ি কেটে দেয়।

এ বছর এখন পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার বড়শি হারিয়েছেন বলে জানান জেনসেন। কোনো কোনো দিন তাঁর ক্ষতির পরিমাণ ৩০ হাজার ডেনিশ ক্রোন পর্যন্ত হয়েছে, যা প্রায় ৩ হাজার ৪৪০ পাউন্ডের সমান।

১ হাজার হাঙর মারার পরিকল্পনা

গ্রিনল্যান্ড শার্ক পৃথিবীর সবচেয়ে কম গতির হাঙর প্রজাতিগুলোর একটি। এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মাংসাশী মাছ। দৈর্ঘ্যে ৬ থেকে ৭ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, এই হাঙর ৪০০ বছরেরও বেশি সময় বাঁচতে পারে।

উত্তর আটলান্টিকের ঠান্ডা ও গভীর পানিতে এদের বিচরণ। গ্রিনল্যান্ডের প্রধান দুই মাছ হ্যালিবাট ও আটলান্টিক কড ধরার সময় এসব হাঙর জেলেদের জালে বা মাছ ধরার সরঞ্জামে আটকে যায়।

এ সমস্যা নতুন নয়। ১৯৬০-এর দশকে গ্রিনল্যান্ড শার্কের যকৃতের তেলের জন্য সরাসরি শিকার বন্ধ হওয়ার পর থেকেই জেলে ও হাঙরের মধ্যে এই বিরোধের কথা জানা যায়।

তবে চলতি বছরের শুরুতে বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। গ্রিনল্যান্ডের তৃতীয় বৃহত্তম শহর ইলুলিসাটের প্রশাসনিক অঞ্চল আভান্নাতা পৌরসভা ১ হাজার গ্রিনল্যান্ড শার্ক মেরে ফেলার একটি পরিকল্পনা অনুমোদন করে। প্রতিটি হাঙরের হৃদপিণ্ডের জন্য ৩০০ ডেনিশ ক্রোন পুরস্কার দেওয়ার কথা ছিল।

পৌরসভার মেয়র লার্স এরিক গ্যাব্রিয়েলসেন বলেন, জেলেদের আয় এবং তাদের মাছ ধরার সুযোগ রক্ষা করা প্রয়োজন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে খাবারের ওপর মানুষ নির্ভর করে আসছে, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

তবে গ্রিনল্যান্ড সরকার পরিকল্পনাটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর সেটি বাতিল করা হয়। ভবিষ্যতে আবার এমন উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে অবশ্য বিতর্ক রয়ে গেছে।

এর আগে ১৯৮৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সাবেক উউমানাক পৌরসভায় একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ডেনমার্কের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির ২০০৭ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সময় ১৯ হাজার ৬৯৭টি গ্রিনল্যান্ড শার্কের হৃদপিণ্ড সংগ্রহ করা হয়েছিল। ২০০০-এর দশকের শুরুতেও সাবেক আসিয়াত পৌরসভায় প্রতিটি হাঙরের জন্য ২০০ ক্রোন পুরস্কারের ব্যবস্থা ছিল।

সংরক্ষণবিদদের উদ্বেগ

সমুদ্র সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করা সংগঠন ওশানস নর্থ কালালিত নুনাত (ওএনকেএন) বলছে, হাঙর মেরে সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ গ্রিনল্যান্ড শার্ক এক বছরে প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত সাঁতার কাটতে পারে।

সংগঠনটির মতে, উত্তর-পশ্চিম গ্রিনল্যান্ডে হাঙর মেরে ফেললেও অন্য এলাকা থেকে নতুন হাঙর সেখানে চলে আসবে।

এমনকি অনেক জেলেও ৩০০ ক্রোনের বিনিময়ে হাঙর ধরতে আগ্রহী নন। জেনসেন বলেন, হাঙর ধরা কঠিন। এজন্য বড়শি ও দড়িতে অতিরিক্ত শক্ত সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হয়। তাই এই অর্থের জন্য কেউ আলাদা করে হাঙর ধরতে চাইবেন না।

তবে সম্ভাব্য হাঙর নিধনের পরিকল্পনায় উদ্বিগ্ন সংরক্ষণবিদরা। কানাডার সাইমন ফ্রেজার বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নিক ডালভি বলেন, কয়েক হাজার গ্রিনল্যান্ড শার্ক মেরে ফেলার পরিকল্পনা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

এই হাঙর প্রায় ১৫০ বছর বয়সে প্রজননক্ষম হয় বলে ধারণা করা হয়। ফলে প্রজাতিটি খুব ধীরগতিতে নিজেদের সংখ্যা বাড়ায়। অতীতে ব্যাপক শিকারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও তারা এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।

১৯৪৮ সালে সবচেয়ে বেশি শিকারের সময় প্রায় ৫৮ হাজার গ্রিনল্যান্ড শার্ক ধরা হয়েছিল। বর্তমানে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে মাছ ধরার সময় প্রায় ৩ হাজার ৫০০ গ্রিনল্যান্ড শার্ক অনিচ্ছাকৃতভাবে ধরা পড়ে বলে ধারণা করা হয়। প্রজাতিটির সংখ্যা এখনো কমছে।

ডালভির ভাষায়, অতিরিক্ত মাছ ধরার কারণে ক্ষতির দিক থেকে গ্রিনল্যান্ড শার্ক সম্ভবত সমুদ্রের সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রজাতিগুলোর একটি।

আসল সমস্যা কি হাঙর, নাকি অতিরিক্ত মাছ ধরা?

গ্রিনল্যান্ডের মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা হাঙরের কারণে নিজেদের সমস্যার কথা বললেও, সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি কেন এতটা খারাপ হয়েছে, তার ব্যাখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

ওএনকেএনের পরিচালক জেনসিরাক পলসেনের মতে, গ্রিনল্যান্ডের মাছ ধরার শিল্পের ওপর চাপ বাড়ছে। দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২৫ শতাংশ আসে এই খাত থেকে।

তিনি বলেন, বাফিন উপসাগর থেকে সব গ্রিনল্যান্ড শার্ক হঠাৎ উধাও হয়ে গেলেও আভান্নাতার উপকূলীয় মাছ ধরার সমস্যা পুরোপুরি দূর হবে না। অতিরিক্ত নৌযান, সীমিত মাছ ধরার কোটা, বাড়তি খরচ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবই বড় সমস্যা।

গ্রিনল্যান্ডের প্রাকৃতিক সম্পদ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, হ্যালিবাটের দাম বাড়লেও প্রতিবছর এই মাছের গড় আকার কমছে। জেনসেন এখনো মাছ ধরে ভালো আয় করতে পারছেন বলে জানান। তবে আগের তুলনায় কম বড়শি ফেলছেন এবং কম মাছ পাচ্ছেন। এর পেছনে গভীর সমুদ্রে বড় ট্রলারের অতিরিক্ত মাছ ধরাকে দায়ী করেন তিনি।

হারানো মাছ ধরার সরঞ্জামও বড় সমস্যা

তবে জেনসেনের মতে, মাছ ধরার সরঞ্জাম হারানোর জন্য শুধু হাঙরকে দায়ী করা যায় না। সমুদ্রে ফেলে রাখা বা হারিয়ে যাওয়া মাছ ধরার দড়ি ও অন্যান্য সরঞ্জামও বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে।

এসব পরিত্যক্ত সরঞ্জামকে ‘ঘোস্ট গিয়ার’ বলা হয়। এগুলো নতুন মাছ ধরার দড়ির সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে সরঞ্জাম নষ্ট করে এবং সামুদ্রিক প্রাণীদেরও আটকে ফেলতে পারে।

ইলুলিসাটের মাছ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান হ্যালিবাট গ্রিনল্যান্ড স্থানীয় এলাকায় এসব পরিত্যক্ত সরঞ্জাম পরিষ্কারের জন্য অর্থ দিচ্ছে। ওএনকেএনের মতে, হাঙর নিধনের চেয়ে এই উদ্যোগ বেশি কার্যকর হতে পারে।

সংগঠনটি মাছ ধরার সরঞ্জাম হারালে জেলেদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা এবং হাঙর দূরে রাখার শব্দভিত্তিক প্রযুক্তি পরীক্ষার জন্য অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাবও দিয়েছে।

গ্রিনল্যান্ডের মৎস্য, শিকার, কৃষি ও স্বনির্ভরতা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেবেকা নিয়োগার্ড বাকের মতে, মাছ ধরার সময় হাঙরসহ অন্যান্য প্রাণী যাতে কম আটকে পড়ে, সে অনুযায়ী নতুন সরঞ্জাম ব্যবহারের নিয়ম করা যেতে পারে। একই সঙ্গে অনিচ্ছাকৃতভাবে ধরা পড়া প্রাণীর তথ্য সঠিকভাবে নথিভুক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

ওএনকেএনের পরিচালক পলসেনের মতে, হাঙর ও জেলেরা একই সামুদ্রিক পরিবেশের অংশ। সাগরের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দুপক্ষের ওপরই চাপ বাড়ছে। তাঁর ভাষায়, হাঙর সমস্যাটির দৃশ্যমান অংশ মাত্র, এর পেছনে রয়েছে আরও বড় কাঠামোগত সংকট।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights