অপহরণে বাড়ছে আতঙ্ক

অনলাইন ডেস্ক

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় অপহরণের চার ঘণ্টা পর মহাসড়কের পাশ থেকে ইশফাতুল ইসলাম নামের এক ছাত্রদল নেতার হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গত রবিবার এই দুর্ঘটনা ঘটে।

তিনি সেখানকার ইউনিয়ন ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। এই অপহরণ ও হত্যার পেছনে আর্থিক কারণ থাকতে পারে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছে পুলিশ।

সম্প্রতি অপহরণের পর হত্যার এমন ঘটনা বেড়েছে। এর মধ্যে শিশু অপহরণের ঘটনাই বেশি। বেশির ভাগ ঘটনায় মুক্তিপণের বিষয়টি থাকে। মুক্তিপণ না পেয়ে হত্যার ঘটনাও কম নয়। অপহরণের পর হত্যার পেছনে অন্য কারণও দেখা যায়। অপহরণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা অনেকে আতঙ্কে রয়েছেন। এরই মধ্যে অনেক শিশুও অপহরণের শিকার হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ৬৯১টি অপহরণের ঘটনায় মামলা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু রাজধানীতেই অপহরণের ঘটনায় মামলা হয় ১২৯টি। সেই হিসাবে অপহরণের ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিনটি মামলা হয়েছে, মাসে প্রায় ৮৬টি।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, জানুয়ারিতে অপহরণের ঘটনায় সারা দেশে মামলা হয়েছে ৮৭টি, এর মধ্যে ঢাকায় মামলা ১৪টি। ফেব্রুয়ারিতে করা ৬৪টি মামলার মধ্যে ঢাকায় ১২টি। মার্চে ১০২টি মামলার মধ্যে ঢাকায় ২০টি, এপ্রিলে ৯৪টি মামলার মধ্যে ঢাকায় ২১টি, মে মাসে ৯০টি মামলার মধ্যে ঢাকায় ১৩টি, জুনে ৯০টি মামলার মধ্যে ঢাকায় ১৭টি, জুলাইয়ে ৭২টি মামলার মধ্যে ঢাকায় ১১টি এবং আগস্টে ৯২টি মামলার মধ্যে ঢাকায় ২১টি।

পুলিশের তথ্য বলেছে, গত আগস্ট পর্যন্ত চলতি বছরের প্রথম আট মাসে সারা দেশে দুই হাজার ৩৬২টি হত্যা মামলা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকায় হত্যা মামলা ১৬৮টি। হিসাব বলছে, ওই আট মাসে প্রতিদিন গড়ে ১০টি হত্যা মামলা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অপহরণের পর হত্যা মামলা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মামলার সংখ্যার চেয়ে প্রকৃত অপহরণের ঘটনা আরো বেশি।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, অপহরণকারীদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সার্বিক অপরাধচিত্র আরো বাড়তে পারে। এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। বেশ কিছু অপহরণের ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, লক্ষ্যে থাকা ব্যক্তিকে আগে থেকে অনুসরণ করা হয়। এরপর সুযোগ বুঝে অপহরণের ঘটনা ঘটে। অনলাইন অ্যাপ ভিত্তিক রাইড শেয়ারিং, ব্যাবসায়িক লেনদেনের ছলে কিংবা প্রেমের সম্পর্কের মাধ্যমে ফাঁদ পেতে অপহরণের ঘটনা ঘটছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, অপহরণের ঘটনায় জড়িত অপরাধীদের গ্রেপ্তারে তৎপর রয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে অপহরণকারীচক্রের অনেক সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাইবার ইউনিট ও ডিজিটাল যোগাযোগের মাধ্যমে সংগঠিত অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও কাজ করছে পুলিশ।

গত ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে মো. হেলাল উদ্দিন নামের এক ব্যবসায়ীকে অপহরণের পর ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে দুর্বৃত্তরা। গত ৭ সেপ্টেম্বর একটি সাদা মাইক্রোবাসে করে তাঁকে অপহরণ করা হয় বলে পুলিশ জানায়। পরদিন তাঁর স্ত্রী জেসমিন আক্তারের মোবাইল ফোন নম্বরে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ চেয়ে হুমকি দেয় দুর্বৃত্তরা।

এর আগে পুরান ঢাকার কদমতলীর রাজাবাড়ি আলি বহর থেকে ওয়াসিম আহমেদ নামের একজনকে অপহরণ করা হয়। পরে তার স্ত্রী সংশ্লিষ্ট থানায় একটি মামলা করেন। গত ২১ সেপ্টেম্বর সাইমুম ইসলাম সাইম নামের এক ব্যক্তিকে গাইবান্ধা থেকে অপহরণের পর মুক্তিপণ দাবি করা হয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, শুধু চলতি বছরই নয়, এর আগে ২০২৫ সালে দেশে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে এক হাজার ১০২টি। তার আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৬৪২। এই হিসাবে ওই বছর অপহরণের সংখ্যা বেড়েছে ৪৬০টি; শতাংশের হিসাবে যা ৭১.৬৫।

তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে মোট ৬৪২ জন অপহৃত হয়েছিল। ওই বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রথম ১০ মাসে অপহৃত হয় ৫০১ জন, মাসে গড়ে ৫০ জন। অথচ চলতি বছরের একই সময়ে মাসিক গড় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯২ জনে।

অপরাধ বিশ্লেষক ও সমাজ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, অপহরণের ঘটনায় সমাজে আতঙ্ক সৃষ্টি হচ্ছে। এখন সামাজিক প্রতিশোধ, প্রেম-বিবাদ কিংবা ডিজিটাল যোগাযোগের অপব্যবহার থেকেও অপহরণের ঘটনা ঘটছে। এ ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের আরো কঠোর হতে হবে।

সৌজন্যে – কালের কণ্ঠ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights