অভিবাসী ইস্যুতে চীনের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞার হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের

অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে অবস্থানরত চীনা নাগরিকদের ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা না করলে চীনের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ কঠোর পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।

ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া ওই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে থাকা চীনা নাগরিকদের পুনরায় দেশে ফেরত নিতে বেইজিংয়ের উদ্যোগ শ্লথ হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ওয়াশিংটন সতর্ক করেছে-চীন যদি অবস্থান পরিবর্তন না করে, তবে দেশটির নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ সংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরও কঠোর করা হতে পারে।

এই নতুন হুমকি এসেছে এমন এক সময়, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী ১৪-১৫ মে বেইজিং সফরের পরিকল্পনা করছেন। সফরকালে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে অভিবাসী প্রত্যাবাসন ইস্যুটি উত্থাপন করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের জন্য এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসন্ন নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বেইজিংয়ের কাছ থেকে বাণিজ্যিক ছাড় আদায় করে তা ভোটারদের সামনে তুলে ধরতে চান তিনি। জনমত জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, এই নির্বাচনে তার দল রিপাবলিকান পার্টি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন কঠোর অভিবাসননীতি অনুসরণ করছে। অবৈধ অভিবাসীদের ব্যাপক হারে বহিষ্কার, ভিসা ও গ্রিন কার্ড বাতিল, এমনকি অভিবাসীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অতীত বক্তব্য যাচাই- সবই এই নীতির অংশ।

মার্কিন কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, বহু বছর ধরেই চীন যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধ সত্ত্বেও হাজার হাজার অবৈধভাবে থাকা নাগরিককে ফেরত নিতে অনাগ্রহ দেখিয়ে আসছে। ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর বেইজিং ‘যাচাইকৃত চীনা নাগরিকদের’ ফেরত নিতে সম্মত হলেও, বাস্তবে প্রক্রিয়াটি দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে পড়ে আছে বলে দাবি ওয়াশিংটনের।

২০২৫ সালের শুরুর দিকে চার্টার ও বাণিজ্যিক ফ্লাইটের মাধ্যমে প্রায় তিন হাজার অভিবাসীকে ফেরত নিলেও গত ছয় মাসে এ সহযোগিতা কমে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্মকর্তা, যিনি পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এসব কথা বলেন।

ওই কর্মকর্তা বলেন, “চীন তাদের নাগরিকদের ফেরত নিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করছে না, যা আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার লঙ্ঘন।”

তিনি আরও জানান, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে যুক্তরাষ্ট্র ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে বাড়তি অর্থ জামানত, আরও বেশি ভিসা প্রত্যাখ্যান এবং সীমান্তে প্রবেশে কঠোরতা আরোপের মতো পদক্ষেপ বিবেচনা করবে।

তবে ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাস এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনও মন্তব্য করেনি। অতীতে বেইজিং বলেছে, তারা অবৈধ অভিবাসনের বিরোধী এবং এটিকে আন্তর্জাতিক সমস্যা হিসেবে দেখে, যা সমাধানে দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

হাজারো অভিবাসী বহিষ্কারের অপেক্ষায়
মার্কিন প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে এক লাখের বেশি নথিহীন চীনা নাগরিক অবস্থান করছেন। এর মধ্যে ৩০ হাজারের বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বহিষ্কারাদেশ রয়েছে। তাদের মধ্যে দেড় হাজারের বেশি ইতোমধ্যে আটক রয়েছেন এবং বহিষ্কারের অপেক্ষায় আছেন। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এদের বেশিরভাগই বিভিন্ন অপরাধে জড়িত।

গবেষণা সংস্থা মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউট (এমপিআই) জানিয়েছে, ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদনহীন চীনা অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৩৯ হাজার হতে পারে।

মার্কিন কর্মকর্তারা আরও দাবি করেছেন, ভারতসহ কিছু দেশ তাদের নাগরিকদের ফেরত নিতে পূর্ণ সহযোগিতা করছে, যেখানে চীন পিছিয়ে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র চায়, বেইজিং দ্রুত ভ্রমণ নথি সরবরাহ করুক এবং মার্কিন অর্থায়নে পরিচালিত চার্টার ফ্লাইটে বহিষ্কৃত নাগরিকদের দেশে ফেরত নিতে অনুমতি দিক।

মার্কিন আইনের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্টের ধারা ২৪৩(ডি) অনুযায়ী, যে দেশগুলো তাদের নাগরিকদের ফেরত নিতে সহযোগিতা করে না, তাদের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ নিয়মিতভাবেই এ তালিকায় চীনকে অন্তর্ভুক্ত করে থাকে।

পূর্ববর্তী প্রশাসনগুলোর সময় থেকেই অভিযোগ রয়েছে, চীন ইচ্ছাকৃতভাবে ভ্রমণ নথি ইস্যুতে বিলম্ব করে। অনেক ক্ষেত্রে তারা এই ইস্যুকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

এছাড়া মার্কিন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কখনও কখনও চীন বহিষ্কার ইস্যুকে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে থাকা অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক অভিযুক্তদের প্রত্যর্পণের দাবির সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করে। সূত্র: রয়টার্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights