আসিম মুনিরের নীতিতে পাকিস্তানের বিপদ বাড়ছে?
অনলাইন ডেস্ক
পাকিস্তান এখন নজিরবিহীন সংকটের মুখামুখি। দেশটির অর্থনৈতিক দুর্দশা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সহিংসতা তীব্র হওয়ার পাশাপাশি প্রধান সেনা অধিনায়ক আসিম মুনিরের প্রশাসনিক পুনর্গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে ঘোর বিতর্ক দেখা দিয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, জেনারেল মুনির পাকিস্তানকে চারটির বদলে ১২, ১৫ কিংবা ১৬০টির মতো ছোট ছোট প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত করতে চান। দৃশ্যত সুশাসনের অজুহাত দেওয়া হলেও মূলত সেনাবাহিনীর ক্ষমতা জোরদার ও অর্থসম্পদ কুক্ষিগত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ছোট ছোট এই ইউনিটগুলো সেনাবাহিনীর অনুগত ব্যক্তিদের দিয়ে পরিচালিত হতে পারে, যা পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব পুরোপুরি নিঃশেষ করে দেবে এবং প্রদেশের পাওনা অর্থ বরাদ্দ বন্ধ করার পথ খুলে দেবে। এর ফলে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সরকারসহ সর্বস্তরে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়া নিশ্চিত।
এদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সের সর্বশেষ তথ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় খাদ্য সংকটে পাকিস্তানকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে ৩৩ শতাংশ শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক খাদ্যের সহজলভ্যতা তলানিতে ঠেকেছে। দেশে তীব্র জ্বালানি সংকট ও পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ৩০০ রুপি ছাড়িয়েছে। অকার্যকর বিদ্যুৎ খাত ও স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের দেনার বোঝা আড়াই ট্রিলিয়ন রুপি ছাড়িয়ে যাওয়ায় করাচি, রাওয়ালপিন্ডি এবং লাহোরের মতো প্রধান শহরগুলোতে চরম লোডশেডিং চলছে। এতে সাধারণ মানুষকে রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছেন। পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলো এই বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও অস্থিরতা থামছে না। কারারুদ্ধ সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে এবং খাইবার পাখতুনখাওয়ায় রাষ্ট্রপতির শাসন জারির প্রতিবাদে হাজার হাজার সমর্থক রাজপথে নেমে এসেছেন। ইসলামাবাদে হাজারেরও বেশি কন্টেইনার দিয়ে রাস্তাঘাট অবরুদ্ধ করে এবং হাজার হাজার নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করে এক নজিরবিহীন অবরোধ গড়ে তোলা হয়েছে, যাকে জনগণ কটাক্ষ করে ‘কন্টেইনারিস্তান’ নাম দিয়েছে।
একইসঙ্গে ইমরান খানের বোন ও মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদিসহ প্রধান রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আফ্রিদির মেয়াদে হাজার হাজার সন্ত্রাসী ঘটনা এবং নিরাপত্তারক্ষীদের প্রাণহানির অশুভ পরিসংখ্যানকে এই গ্রেপ্তারের বাহানা হিসেবে ব্যবহার করা হলেও পুলিশ বাহিনী দীর্ঘ দিন ধরেই সেখান থেকে সামরিক বাহিনী প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছিল।
অন্যান্য অঞ্চলেও অস্থিতিশীলতা চরমে পৌঁছেছে। পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের পুঞ্চ বিভাগে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলো সংলাপের দাবি জানিয়েছে। ওদিকে গিলগিত-বালতিস্তানেও শীর্ষনেতাদের বন্দি করে রাখা হয়েছে, যা এমনকি জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলেও উত্থাপিত হয়েছে। এছাড়া চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে সহিংসতায় প্রাণহানির হার ৮৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার মধ্যে আশঙ্কাজনক বড় অংশটি ঘটেছে বেলুচিস্তানে। পশ্চিমাঞ্চলে আফগানিস্তান সীমান্তেও যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে তালেবান বাহিনী সস্তা ও উন্নত ড্রোন দিয়ে পাকিস্তানি সেনা ঘাঁটিতে আক্রমণ চালাচ্ছে। সেই সাথে ইরানের সীমান্ত বাণিজ্য স্থগিত রাখা এবং তেহরানে সেনাপ্রধানের ঠান্ডা অভ্যর্থনা পাওয়া পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে। এমন এক বহুমাত্রিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে সীমান্ত পুনর্নির্ধারণের মতো চরম সিদ্ধান্ত পাকিস্তানকে এক অনিশ্চিত ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সূত্র: ফার্স্ট পোস্ট
