ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে ‘পূর্ণ সমর্থন’ দিলেন ট্রাম্প
অনলাইন ডেস্ক
ইসরায়েলের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি ‘পূর্ণ ও নিঃশর্ত সমর্থন’ জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন সামনে রেখে গতকাল রবিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে নেতানিয়াহুর প্রশংসা করেন তিনি।
তিনি বলেছেন, নেতানিয়াহু ছাড়া অন্য যেকোনো প্রার্থীই হবেন ‘ভুল’ নেতা এবং তিনি না থাকলে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে একাই লড়তে হবে।
ইতিহাসে এই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইসরায়েলের নির্বাচনে নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থীকে প্রকাশ্যে ও সরাসরি সমর্থন জানালেন।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ডাকনাম ব্যবহার করে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘বিবি নেতানিয়াহু আপনাদের কখনও নিরাশ করবেন না!’ ইরানে যুদ্ধ থামানোর মার্কিন প্রচেষ্টা নিয়ে গত কয়েক মাসে নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্পের মতবিরোধ চলছিল। এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার ট্রাম্প বলেছিলেন, ইসরায়েলের নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার কথা তিনি ‘চিন্তাই করেননি’। সেই মন্তব্যের পরই রোববার তার এই আকস্মিক সমর্থনের ঘোষণা এল।
নেতানিয়াহু ও তার মিত্ররা ট্রাম্পের এই সমর্থনকে বড় করে প্রচার করছেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর বিরোধীরা বলছেন, তারা ট্রাম্পকে সম্মান করেন ঠিকই, তবে ইসরায়েলের জনগণই নিজেদের নেতা নির্বাচন করবে।
মিত্রদের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ না করার যে দীর্ঘদিনের প্রথা মার্কিন প্রেসিডেন্টদের ছিল, খামখেয়ালি স্বভাবের এই মার্কিন নেতা তা অনেক আগেই ভেঙেছেন। এর আগেও তিনি বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে নানা প্রার্থীকে সরাসরি সমর্থন জানিয়েছেন।
রোববার ট্রুথ সোশ্যালে ‘ইসরায়েলের মহান জনগণের’ উদ্দেশে দেওয়া পোস্টে নেতানিয়াহুর প্রতি ‘পূর্ণ ও নিরঙ্কুশ সমর্থন’ ব্যক্ত করেন ট্রাম্প। পোস্টে তিনি নেতানিয়াহুকে ‘একজন মহান লড়াকু প্রধানমন্ত্রী এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মোকাবিলায় শান্তির এক বড় মাপের অংশীদার’ হিসেবে আখ্যা দেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। যুদ্ধের জেরে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়তে থাকায় আগামী মাসে অনুষ্ঠিতব্য মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি ব্যাপক জনসমর্থন হারিয়েছে।
নিজের পোস্টে ট্রাম্প এ যুদ্ধের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, ‘ছোট শয়তান ও বড় শয়তান’—অর্থাৎ যথাক্রমে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ধ্বংস করার যে প্রতিজ্ঞা ইরান করেছিল, সেটি তারা বাস্তবায়ন করতই। কিন্তু তার বদলে দেশটি নিজেই ‘সামরিক ও অর্থনৈতিক দুই দিক থেকেই পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে; আর তারা যদি দ্রুত নিজেদের পথ পরিবর্তন না করে, তবে আমরা শিগগিরই বাকি কাজটুকুও শেষ করব।’
ট্রাম্প বলেন, ‘ইসরায়েলে যদি ভুল কোনো নেতা আসেন—বিবি ছাড়া অন্য যে-কেউই তা হবে—তাহলে এই কাজ আমেরিকাকে একাই করতে হবে। আর আমি তা করতে আগ্রহী নই। খোদ ইসরায়েলের ভেতর থেকে আসা প্রচণ্ড বিরোধিতাসহ নানামুখী প্রতিকূলতার মুখেও বিবি নেতানিয়াহু বরাবরই দৃঢ়, সাহসী ও মেধার পরিচয় দিয়েছেন।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘আমি সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোতে বিবিকে দেখেছি। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ যেকোনো নারী বা পুরুষ চাপের মুখে ভেঙে পড়তেন—কিন্তু বিবি ভেঙে পড়েননি; বরং আরও শক্তিশালী হয়েছেন এবং আজও সেই একই দৃঢ়তা ধরে রেখেছেন। ইসরায়েলের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এত কিছু করেছে; ফলে তাদের কাছ থেকে এমন একজন অংশীদারই আমেরিকা প্রত্যাশা করে।”‘
ট্রাম্পের সমর্থন ঘোষণার সাত মিনিট পরই তাকে ধন্যবাদ দিয়ে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন নেতানিয়াহু। ওই ভিডিওর ক্যাপশনে তিনি লেখেন: ‘অসাধারণ সমর্থন ও যৌথ কাজের জন্য ধন্যবাদ, প্রেসিডেন্ট।’
হিব্রু ভাষায় দেওয়া আরেকটি ভিডিও বিবৃতিতে নেতানিয়াহু বলেন, ট্রাম্প ‘আগামী দুই বছর বা তারও আগে ইরানের হুমকি নির্মূল করার’ কাজ শেষ করবেন। তবে সেটি তিনি করবেন কেবল নেতানিয়াহুকে নিয়ে, অন্য কারও সঙ্গে নয়।
ট্রাম্পের সমর্থন এই মুহূর্তে নেতানিয়াহুর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে তিনি এখন কোণঠাসা। অধিকাংশ জনমত সমীক্ষায় ইঙ্গিত, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসন জিততে ব্যর্থ হতে পারে তার জোট।
চলতি সপ্তাহের গোড়া থেকেই নেতানিয়াহুকে সমর্থন জানানোর পরিকল্পনা করছিলেন ট্রাম্প। রোববার অ্যাক্সিওসকে ফোনে দেওয়া সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি বরাবরই এটা করতে চেয়েছিলাম। শুধু বেশি আগেভাগে করে ফেলতে চাইনি।’
ট্রাম্প বলেন, নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার ‘সুসম্পর্ক’ রয়েছে। নেতানিয়াহু ফের নির্বাচিত হলে তারা একসঙ্গে ‘ভালো কাজ’ চালিয়ে যেতে পারবেন বলেই এই সমর্থন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট অ্যাক্সিওসকে আরও বলেন, ‘ইসরায়ালের নেতৃত্বে এমন একজন থাকা জরুরি, যার ওপর সেখানকার মানুষ ভরসা করতে পারবে।’
ইসরায়েলের অন্য কোনো নেতার সঙ্গে তিনি কাজ করতে পারবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘হয়তো পারব, হয়তো পারব না। কিন্তু সেই ঝুঁকিটাই বা কে নিতে চায়?’
ইরান ও গাজা ঘিরে গত কয়েক মাসে দুই নেতার মধ্যে টানাপড়েন বেড়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহুকে সমর্থন জানাতে এত দিন বারবার অস্বীকার করছিলেন ট্রাম্প।
এর আগে অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বীদের একাংশ ট্রাম্পকে নিরপেক্ষ থাকার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের একাংশেরও মত ছিল, নেতানিয়াহু হেরে গেলে এবং ইসরায়েলে নতুন সরকার গঠিত হলে পশ্চিম এশিয়ায় ট্রাম্পের কূটনৈতিক লক্ষ্য পূরণ করা অনেক সহজ হবে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্পও নেতানিয়াহুর ওপর বিরক্ত ছিলেন। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এ বিষয়ে সরাসরি কথা হয়েছে, এমন দুই ব্যক্তির দাবি—অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ঠেকাতে ইসরায়েলের ব্যর্থতার জন্য নেতানিয়াহুকেই দায়ী করেছিলেন ট্রাম্প। এমনকি নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছিলেন তিনি।
তবে যাবতীয় টানাপড়েন সত্ত্বেও শেষপর্যন্ত নেতানিয়াহুর পাশেই থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন ট্রাম্প।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের আগেই ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় সামরিক অভিযান চালানো যায় কি না, তা নিয়ে দুই সপ্তাহ আগে আলোচনা করেছিলেন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু।
প্রথমে নেতানিয়াহুর প্রস্তাবে সায় দিয়ে ফের হামলা শুরু করার দিকে ঝুঁকেছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু পরে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন তিনি। শেষপর্যন্ত নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
তবে রবিবারের সমর্থনবার্তায় ট্রাম্প লিখেছেন, ”বাকি কাজটুকুও আমরা শীঘ্রই সেরে ফেলব।’ ধারণা হচ্ছে, এর মাধ্যমে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর নেতানিয়াহুকে ইরানে হামলা চালানোর সবুজ সংকেত দিয়ে রাখলেন তিনি।
সূত্র: আলজাজিরা, রয়টার্স
