এফডিসি কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স নির্মাণে গাফিলতি

মোস্তফা মতিহার

চলচ্চিত্রশিল্পের আঁতুড়ঘর-খ্যাত বিএফডিসি একসময় মুখরিত থাকত শিল্পী ও কলাকুশলীদের আনাগোনায়। আলোর ঝলকানির সঙ্গে শিল্পী ও কলাকুশলীদের পদচারণে প্রাণের উচ্ছ্বাসের ঢেউ খেলত সিনেমা নির্মাণের এ প্রতিষ্ঠানটিতে। আকাশ সংস্কৃতির উন্মুক্ততায় দর্শক হারিয়ে ক্রমবর্ধমান হারে যখন একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হতে থাকে তখন সিনেমা নির্মাণেও লাগাম টেনে ধরেন প্রযোজক ও নির্মাতারা। এতে লোকসানের কবলে পড়ে এফডিসি। লোকসান থেকে টেনে তোলার জন্য ৩, ৪ ও ৫ নম্বর ফ্লোর ভেঙে সেখানে কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেয় বিএফডিসি কর্তৃপক্ষ। ২০১৮ সালে তিন বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৩২২ কোটি ৭৭ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। ২০২১ সালে কমপ্লেক্সটি উদ্বোধন করার কথা থাকলেও সঠিক সময়ে নির্মাণকাজ শুরু করতে না পারায় পরবর্তীতে কাজের মেয়াদ আরও তিন বছর বৃদ্ধি করে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। কিন্তু ২০২৬ সালের আট মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও বহুলপ্রতীক্ষিত এই কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সটির কাজ শেষ করতে পারেনি বিএফডিসি কর্তৃপক্ষ। বারবার মেয়াদ বাড়ানোর পরও নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় ৪২ কোটি ৭৩ লাখ ১৪ হাজার টাকা বেড়ে ৩২২ কোটি ৭৭ লাখ ৮৬ হাজার টাকার এ প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৬৫ কোটি ৫১ লাখ টাকায়। আর কর্তৃপক্ষের গাফিলতি, নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে আট বছরেও শেষ হয়নি তিন বছর মেয়াদি এ কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সের নির্মাণ। প্রকল্পটি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কালক্ষেপণ ও ব্যয় বৃদ্ধিতে সিনেমাপাড়ার মানুষের মাঝে নানা ধরনের প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি এখনো প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি। বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও বছরের পর বছর ধরে প্রকল্পটি কেন ঝুলে আছে এমন জিজ্ঞাসা খোদ সিনেমাপাড়ার মানুষেরই। প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করার জন্যই কি নির্মাণকাজে গাফিলতি করা হচ্ছে? এমন প্রশ্নও চলচ্চিত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের। তিন বছর মেয়াদি ও ৩২২ কোটি ৭৭ লাখ ৮৬ হাজার টাকার প্রকল্পটি আট বছরেও শেষ করতে না পারার কারণে প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ৩৬৫ কোটি ৫১ লাখ ৫৩ হাজার টাকায় এসে দাঁড়ানোর রহস্যটাই বা কি? ৪২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা বৃদ্ধির গোপন সূত্রটা কি অজানাই থেকে যাবে নাকি এটা শুভংকরের ফাঁকি, ব্যয় বাড়িয়ে নিজেদের পকেট গরম করার জন্য কি নির্মাণকাজের মেয়াদ আরও কয়েক ধাপ বাড়বে এমন অজানা প্রশ্ন ভেসে বেড়াচ্ছে প্রযোজক, নির্মাতা, শিল্পী ও কলাকুশলীদের মাঝে। প্রকল্পের ধীরগতির কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা প্রকল্প পরিচালক ও ঠিকাদার নিয়োগে বিলম্ব, ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন, অর্থছাড়ে জটিলতা এবং করোনা মহামারির কথা জানিয়েছেন। ঠিকাদারি চুক্তি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রকল্পের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্বে মেসার্স বিশ্বাস ট্রেডিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তিতে মূল্য সমন্বয়সংক্রান্ত একটি শর্ত যুক্ত করা হয়েছিল, যা সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদিত দলিলে ছিল না বলে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া নির্মাণকাজে বিভিন্ন গ্রেডের রড ব্যবহারের বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পের একটি অংশে গভীর নলকূপ নির্মাণ নিয়েও ঝুঁকির কথা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এসব অভিযোগের যথাযথ তদন্ত হয়েছে কি না, হলেও তার ফলাফল কী-তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণকাজ বিভিন্ন সময়ে বন্ধ ছিল। এমনকি ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ৫ মার্চ পর্যন্ত ভবন নির্মাণের কাজ বন্ধ থাকার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কাজ বন্ধ থাকার ঘটনাও রহস্য বাড়াচ্ছে। এ বিষয়ে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিস ও তাগাদাপত্র দেওয়া হয়েছিল। ফলে প্রশ্ন উঠছে-সরকারি অর্থে বাস্তবায়নাধীন এত বড় একটি প্রকল্পে দীর্ঘ সময় নির্মাণকাজ বন্ধ থাকার দায় কার? ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? আর প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির আর্থিক দায় শেষ পর্যন্ত কে বহন করছে?

বিএফডিসির আয় বাড়ানোর স্বপ্ন, বাস্তবে অনিশ্চয়তা

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বিএফডিসির আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে ধারণা করা হয়েছিল। সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে বছরে প্রায় ৫২ কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ ছিল। কমপ্লেক্সে থাকবে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, পার্কিং সুবিধা, সিনেপ্লেক্সসহ বিভিন্ন সুযোগসুবিধা। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় সেই সম্ভাবনা এখনো বাস্তবে রূপ নেয়নি। বরং নির্মাণকাজের জন্য এফডিসির বিদ্যমান কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ভেঙে ফেলায় প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ও আয়েও প্রভাব পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

নেপথ্যে কি শুধু অব্যবস্থাপনা, নাকি অনিয়মও?

প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা, বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন, চুক্তির শর্ত নিয়ে প্রশ্ন, নির্মাণকাজ বন্ধ থাকা, কাজের মান নিয়ে অভিযোগ এবং ব্যয় বৃদ্ধির ঘটনা-সব মিলিয়ে এফডিসি কমপ্লেক্স প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। তবে এসব বিষয়কে দুর্নীতি হিসেবে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের যাচাই। প্রকল্পের দরপত্র, কার্যাদেশ, চুক্তি, বিল-ভাউচার, কাজের পরিমাপ বই, সংশোধিত ডিপিপি এবং প্রকৌশলগত পরীক্ষার প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলে প্রকল্পের অর্থ ব্যয় ও নির্মাণকাজের স্বচ্ছতা নিয়ে অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে। কাজের ধীরগতি ও অনিয়ম নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) মহাপরিচালক মাসুমা তানি বলেন, যে গতিতে কাজ হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি।

কনস্ট্রাকশন কোম্পানিকে বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও তারা গাফিলতি করছে। যথাসময়ে কাজ বুঝিয়ে না দিলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য লিগ্যাল নোটিস পাঠানো হয়েছে। কিন্তু তারা কোনো সদুত্তর দেয়নি। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে ৪০-৫০ বার চিঠি দিলেও তারা কর্ণপাত করেনি। মন্ত্রণালয় থেকে বারবার তাগাদা দেওয়া হলেও নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কর্ণপাত করছে না। যার কারণে মন্ত্রণালয় থেকে স্পেশাল মনিটরিং অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা এখন নির্মাণকাজের মনিটরিং করছেন। কাজের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানিয়ে এফডিসির এমডি আরও বলেন, আমরা তাগিদ দিয়ে কাজ করাচ্ছি। বর্তমানে কাঠামো রেডি। ছাদ ঢালাই হয়ে গেছে। ফিটিংস ও এলসি করে জিনিসপত্র আনা বাকি। তিনি জানান, ২০১৮ সালে প্রকল্প পাস হলেও কাজ শুরু হয় ২০২২ সালে। প্রথম প্ল্যানে ২০২১ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু টেন্ডার হয়েছে ২০২১ সালের এপ্রিলে। পরবর্তীতে সেটি সরকারি ক্রয় কমিটিতে অনুমোদন হয়। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে সাইট বুঝে নেয় নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। এরপর প্রজেক্ট ডিরেক্টর (পিডি) নিয়োগ করা হয়েছে ২০২১ সালে। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে পিডি চলে যায়। এরপর সরকার পরিবর্তনের পর কাজের গতি কমে যায়। সবকিছু মিলিয়ে কমপ্লেক্সটির নির্মাণকাজ শেষ হতে অনেক দেরি হচ্ছে। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে আমরা নিয়মিত তাগাদা দিয়ে যাচ্ছি। দুই ধাপে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কেন কাজ শেষ হয়নি, কেন আর নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিষয়ে জানতে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিশ্বাস বিল্ডার্সের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাদের পাওয়া যায়নি। আর কত সময় ও কত টাকা ব্যয় হলে শেষ হবে এফডিসির এই বহুলপ্রতীক্ষিত কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স? এমন জিজ্ঞাসা সিনেমা অঙ্গনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের। সরকারি অর্থের এ প্রকল্পে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে কার্যকর তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights