কংক্রিটের শহরে সবুজের কারিগর
অনলাইন ডেস্ক
ঘাসে পা রাখতেই নরম এক অনুভূতি। পাশে টলটলে পানির লেকে মাছের ছুটোছুটি। বাতাসে দুলছে বাঁশের পাতা। কাঠের দোলনায় বসে গল্প করছেন কেউ, আবার কেউ মোবাইল ফোনে বন্দী করছেন চারপাশের দৃশ্য। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, কোনো গ্রামের বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছেন। অথচ জায়গাটি রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জাতীয় বৃক্ষমেলা। সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে এমন এক সবুজ পরিসর, যেখানে কিছু সময়ের জন্য হলেও ভুলে যাওয়া যায় শহরের যানজট, কংক্রিট আর ধুলোর কথা।
এই ছোট্ট গ্রামের নেপথ্যে রয়েছেন মো. রকিবুল আমিন। তিনি শুধু একজন উদ্যোক্তাই নন, প্রকৃতিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তোলার স্বপ্ন নিয়ে কাজ করা একজন সবুজ-সৈনিক। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম ‘গার্ডেনিং বাংলাদেশ’। ছাদ, বারান্দা, অফিস, দেয়াল কিংবা ছোট্ট একটি ঘরের কোণ—যেখানে সামান্য জায়গা পাওয়া যায়, সেখানেই প্রকৃতির ছোঁয়া পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে তাঁর প্রতিষ্ঠান।
রকিবুল বলেন, ‘বড় হয়ে দেখি শহরে মানুষ চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ। সবুজ বলে কিছু নেই। এই অভাবটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছিল। তখনই মনে হয়েছিল, মানুষের ঘরে যদি প্রকৃতির স্পর্শ ফিরিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে শহরও কিছুটা প্রাণ ফিরে পাবে।’

তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘গার্ডেনিং বাংলাদেশ’। ২০১৯ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। বর্তমানে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক, রিসোর্ট, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, পোশাক কারখানা, আবাসন প্রকল্প, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ইকোপার্ক, লেক এবং ব্যক্তিগত বাসভবনে সবুজায়নের কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। ইতোমধ্যে তারা শতাধিক ছোট-বড় ল্যান্ডস্কেপ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।
রকিবুলের কাছে গাছ শুধু সৌন্দর্যের উপকরণ নয়, মানুষের সুস্থতারও অংশ। তিনি বলেন, ‘সবুজটা হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষ গাছের পাতা ছুঁয়ে দেখার অভ্যাসও হারিয়ে ফেলছে। আমি চাই প্রত্যেক মানুষ প্রতিদিন অন্তত একবার গাছের সঙ্গে সময় কাটাক। একটি গাছ শুধু অক্সিজেন দেয় না, মানুষের মনও ভালো রাখে। সবুজ দেখলে চোখের ক্লান্তি দূর হয়, মন শান্ত হয়।’এই ভাবনা থেকেই তিনি ‘জিরো সয়েল’ ধারণা নিয়ে কাজ করছেন।
রকিবুল বলেন, ‘আমি চাই আগামী প্রজন্ম এমন একটি বাংলাদেশ পাক, যেখানে গাছের জন্য আলাদা করে খুঁজতে হবে না। প্রতিটি ছাদ, প্রতিটি বারান্দা, প্রতিটি স্কুল, প্রতিটি অফিসে অন্তত কিছুটা সবুজ থাকবে।’

দীর্ঘদিনের এই প্রচেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ‘বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার-২০২৫’-এ বৃক্ষ গবেষণা, সংরক্ষণ ও উদ্ভাবন শাখায় জাতীয় পরিবেশ পুরস্কার পেয়েছেন রকিবুল আমিন।
তবে তাঁর কাছে পুরস্কার কোনো গন্তব্য নয়, বরং নতুন পথচলার অনুপ্রেরণা। তিনি বলেন, এই পুরস্কার আমাকে আরও বড় দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমি চাই মানুষ আবার গাছের কাছে ফিরুক।
