কম দামে আটকাচ্ছে পোশাক রপ্তানি
শাহেদ আলী ইরশাদ
► নতুন বৈশ্বিক ক্রেতাদের আনতে কাজ চলছে – মাহমুদ হাসান খান, সভাপতি, বিজিএমইএ
► কম দামের সঙ্গে মূল্য ও জটিল পোশাক উৎপাদনের সক্ষমতার চাপ
বৈশ্বিক সরবরাহ নেটওয়ার্কে ঝুঁকি কমাতে বড় ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো ক্রয় ও উৎপাদন কৌশলে পরিবর্তন আনছে। এতে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ ধীরে ধীরে অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বড় ক্রেতারা ভারতসহ বিভিন্ন দেশে ক্রয়াদেশ বাড়াচ্ছে বলে জানিয়েছেন দেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা।
শিল্প-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের পর বড় বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা কমে যাওয়ার আশঙ্কা, ভারতের সঙ্গে ইইউর বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা, ভিয়েতনামের ইইউ বাজারে বাণিজ্য সুবিধা এবং দেশে উৎপাদন ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ক্রেতাদের আগ্রহে পরিবর্তন আসছে। এতে কম দামের সাধারণ পোশাকের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের ও জটিল পোশাক উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়েছে। কয়েকজন রপ্তানিকারক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, এইচঅ্যান্ডএম, ইন্ডিটেক্স ও প্রাইমার্কের মতো বড় ইউরোপীয় ক্রেতারা ধীরে ধীরে বাংলাদেশের কিছু ক্রয়াদেশ অন্য দেশে সরিয়ে নিচ্ছে। এক রপ্তানিকারকের দাবি, ভারত থেকে তুলনামূলক কম দামে পোশাক পাওয়ায় সেখানে ক্রয়াদেশ বাড়াচ্ছে এসব ক্রেতা। ভারত-ইইউ বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে পণ্যের দাম আরও প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে বলেও তারা মনে করছেন।
ওই রপ্তানিকারক জানান, প্রাইমার্কের হয়ে কাজ করা একটি বায়িং হাউস সম্প্রতি ভারতে দুটি নতুন অফিস স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহমুদ হাসান খান গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ঝুঁকি কমাতে সরবরাহ ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনছেন। মানসম্পন্ন পোশাকের পাশাপাশি ব্যয়-দক্ষতা নিশ্চিত করতে ক্রেতারা সাধারণত একটি দেশের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করেন না। ব্র্যান্ড ও সরবরাহকারী-উভয়ের জন্যই সরবরাহ কৌশল নির্ধারণ একটি চলমান প্রক্রিয়া। তিনি জানান, নতুন বৈশ্বিক ক্রেতাদের বাংলাদেশে আনতে বিজিএমইএ কাজ করছে। পাশাপাশি বিদ্যমান ক্রেতাদের কাছ থেকে ক্রয়াদেশ বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এদিকে ক্লিন ক্লোদস ক্যাম্পেইনের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বৈশ্বিক ফাস্ট-ফ্যাশন কোম্পানিগুলোর সোর্সিং কৌশলে পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, এইচঅ্যান্ডএম ‘প্রক্সিমিটি সোর্সিং’-এর দিকে ঝুঁকছে। জটিল নকশার টি-শার্টের উৎপাদন ভোক্তা বাজারের কাছাকাছি নেওয়া হলেও সাধারণ ও কম দামের পোশাকের উৎপাদনে বাংলাদেশকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর ফলে বাংলাদেশ থেকে এইচঅ্যান্ডএমের তুলার টি-শার্টের ক্রয়াদেশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং স্থানীয় ক্রয়াদেশ মূলত কম দামের পণ্যে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। ২০২১ সালে এইচঅ্যান্ডএম ইন্ডিটেক্সের তুলনায় গড়ে ১৬ শতাংশ বেশি দামে টি-শার্ট কিনলেও ২০২৫ সালে চিত্র বদলে যায়। ওই বছর ইন্ডিটেক্স এইচঅ্যান্ডএমের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ বেশি দামে টি-শার্ট কিনেছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য কম দামের সাধারণ পোশাকে বাজার ধরে রাখার পাশাপাশি উচ্চমূল্যের ও জটিল পোশাক উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বাড়াতে ভৌগোলিক নৈকট্য ও জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে।
বাংলাদেশের ক্রয়াদেশ ও মোট ক্রয়াদেশে দেশের অংশ সম্পর্কে জানতে চাইলে এইচঅ্যান্ডএম গ্রুপের মিডিয়া রিলেশনস কর্মকর্তা পারনিলে স্ক্যানভিগ শেনাও বলেন, পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি ও গ্রাহকের চাহিদার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে এইচঅ্যান্ডএম তার সরবরাহ ব্যবস্থার কৌশল নিয়মিত পরিবর্তন করছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন উৎসবাজারে সরবরাহকারী সংখ্যা কমিয়ে আরও কৌশলগত অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে। এর মাধ্যমে পণ্যের মান ও টেকসই উৎপাদনের ধারাবাহিকতার পাশাপাশি সরবরাহকারীদের জন্য স্থিতিশীল ক্রয়াদেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশকে এখনো গুরুত্বপূর্ণ সোর্সিং বাজার হিসেবে দেখছে এইচঅ্যান্ডএম। প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশে চার দশকের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা বলেন, স্থানীয় পোশাক প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব তাদের বৈশ্বিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এইচঅ্যান্ডএমের সর্বশেষ প্রকাশিত সরবরাহকারী তালিকা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির জন্য পোশাক তৈরি করছে প্রায় ১৮৯টি উৎপাদন ইউনিট।
২০২০ সালের তালিকায় এ সংখ্যা ছিল প্রায় ২৩৫টি।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, এইচঅ্যান্ডএম বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ৩০০ কোটি থেকে ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলারের পোশাক সংগ্রহ করে। ফলে সরবরাহকারী সংখ্যা কমলেও বাংলাদেশ এখনো প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম বড় উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে রয়েছে।
