কাল সাকরাইন, জৌলুস হারিয়েছে উৎসব

শামছুল হক রাসেল
কাল রবিবার সাকরাইন উৎসব। পুরান ঢাকার আকাশ থাকবে ঘুড়িওয়ালাদের দখলে। নীল আকাশে শোভা পাবে নানা রঙ আর বাহারির ঘুড়ি। ঐতিহ্যবাহী সাকরাইন উৎসবের চিত্র এমনটাই থাকে পুরান ঢাকায়। একে ঘুড়ি উৎসব বা পৌষ সংক্রান্তিও বলে। একটা সময় এ উৎসবটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে পুরান ঢাকায় সাড়ম্বরে পালিত হয় দিনটি। উৎসবে অংশ নেন সব ধর্মের সব বয়সী মানুষ। গত কয়েক বছর ধরে, অন্যান্য এলাকা বিশেষ করে ‘নতুন ঢাকা’ হিসেবে পরিচিত এলাকার তরুণ-তরুণীরাও এ উৎসবে যোগ দিতে ছুটে যান পুরান ঢাকায়।

মূলত পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়া, ধূপখোলা, দয়াগঞ্জ, মুরগীটোলা, নারিন্দা, সূত্রাপুর, কাগজিটোলা, বাংলাবাজার, লক্ষ্মীবাজার, কলতাবাজার, ধোলাই খাল, শাঁখারীবাজার, রায়সাহেব বাজার, নবাবপুর, বংশাল, নাজিরাবাজার, তাঁতী বাজার, লালবাগ এবং হাজারীবাগ এলাকার মানুষ এ উৎসবে দিনব্যাপী ঘুড়ি উড়ান। আয়োজন করেন নানা খাবারের। বর্তমানে সন্ধ্যায় আতশবাজি ফোটানো এ উৎসবের অন্যতম অঙ্গ। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে হালের ডিজে পার্টি। পুরান ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব কমে গেছে আগের তুলনায়। এখন নানা জটিলতায় তরুণরা সাকরাইন উৎসবে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এছাড়াও আধুনিক যুগের ডিজে পার্টি এবং আতশবাজির কারণে সাকরাইন ঘুড়ি উৎসব তার নিজস্ব ঐতিহ্য হারিয়েছে। বর্তমানে এই ডিজে পার্টি সাকরাইন উৎসবের অন্যতম বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা। এমনকি এই ডিজেপার্টিকে কেন্দ্র করে নানা নেতিবাচক ঘটনাও ঘটেছে গত কয়েক বছরে।

সাকরাইন উৎসবের দিনে সকাল থেকেই ছাদে ছাদে শুরু হয়ে যায় ঘুড়ি ওড়ানোর উন্মাদনা। ছোট-বড় সবার অংশগ্রহণে মুখরিত থাকে প্রতিটি ছাদ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে উৎসবের জৌলুস। আর আকাশে বাড়ে ঘুড়ির সংখ্যা। সকালের তুলনায় বিকালে এ উন্মাদনা পরিপূর্ণতা লাভ করে। ছাদের উপর চলে গানবাজনা আর খাওয়া-দাওয়া। সে সঙ্গে আনন্দের উত্তাপকে আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দেয় ঘুড়ির কাটাকাটি খেলা।
এছাড়া ঘরে ঘরে তৈরি হয় পিঠা বানানোর ধুম। বর্তমানে এ উৎসবে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। অর্থাৎ সন্ধ্যার পর থেকেই শুরু হয়ে যায় আতশবাজি। সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত এসব এলাকায় চলে আতশবাজির খেলা। সাকরাইনে পুরান ঢাকায় শ্বশুরবাড়ি থেকে জামাইদের নাটাই, বাহারি ঘুড়ি উপহার দেওয়া এবং পিঠার ডালা পাঠানো একটি অবশ্য পালনীয় রীতি। ডালা হিসেবে আসা ঘুড়ি, পিঠা আর অন্যান্য খাবার বিলি করা হয় আত্মীয়-স্বজন এবং পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে। তবে এ প্রচলন এখন খুব একটা দেখা যায় না। আরও জোর দিয়ে বলা যায় এটা এখন নেই বললেই চলে।

এ উৎসবকে মাথায় রেখে গত এক সপ্তাহ পুরান ঢাকার বায়ান্নো বাজার তেপ্পান্ন গলির অধিকাংশ বাড়ির খোলা ছাদে হয়েছে সুতা মাঞ্জা দেওয়ার ধুম। এ উৎসব উপলক্ষে শাঁখারীবাজার, নারিন্দা, ধোলাইখাল, ধূপখোলা, গেন্ডারিয়াসহ অলিগলিতে নানা রঙের ঘুড়ির পসরা সাজিয়ে বসেছেন দোকানিরা। তবে আগের মতো বেচাকেনা নেই বলে জানান বিক্রেতারা। শেষ মুহূর্তে বেচাকেনার আশায় প্রহর গুণছেন তারা। সরেজমিনে গিয়ে পুরান ঢাকার দোকানগুলোতে নানা ধরনের ঘুড়ি দেখা যায়। তবে কমেছে বেচাকেনা। আগের মতো জৌলুস নেই ঘুড়ি বেচাকেনায়। পুরনো গৌরব হারিয়ে আধুনিকতার ছোঁয়ায় পরিবর্তন এসেছে পুরান ঢাকার সাকরাইন উৎসবেও। ব্যবসায়ীরা বললেন, আগে কখনো এমনটা হয়নি। এবারে বেচাকেনা খুবই কম। সাকরাইন এলে আগে ঘুড়ি বেচাকেনায় ধুম পড়ে যেতো শাঁখারীবাজারসহ পুরো পুরান ঢাকাতে। সাকরাইন উপলক্ষে আগে প্রায় ২০-২৫ লাখ টাকা বেচাকেনা হলেও এখন সবমিলিয়ে ১০-১৫ লাখ টাকা হয়। এছাড়া পুরান ঢাকার মানুষেরা কেমন জানি বদলে গেছে এখন। আশা করছি আজ শনিবার ও আগামীকাল দুপুরের মধ্যে ভালো বেচাকেনা হবে।

ব্যবসায়ীদের মতে, সবকিছুর দাম বাড়ায় বেচাকেনা কমেছে। গতবারের চেয়ে এবার আরও খারাপ বেচাকেনা। সেই সাথে পুরো পুরান ঢাকা জুড়ে অলি-গলিতে তরুণরা এখন মোবাইল গেইমে আসক্ত হয়ে সাকরাইন ঘুড়ি উৎসবের আমেজ ভুলে গেছে।

উল্লেখ্য, সাকরাইন বাংলাদেশের প্রাচীন উৎসবগুলোর একটি। এটি মূলত ঘুড়ি উৎসব। পৌষ মাসের শেষ দিন জানুয়ারির ১৪ অথবা ১৫ তারিখে এ উৎসব হয়ে থাকে। সাকরাইন মূলত পৌষ সংক্রান্তি ঘুড়ি উৎসব। সংস্কৃত শব্দ ‘সংক্রান্তি’ অপভ্রংশে সাকরাইন হয়েছে। যা এক পর্যায়ে ঢাকাইয়া উৎসবে রূপ নেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights