কীভাবে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম কোম্পানিতে পরিণত হলো আম্বানির জিও

অনলাইন ডেস্ক

ভারতের আর্থিক রাজধানী মুম্বাইয়ে জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে এ সপ্তাহে শেয়ারবাজারে যাত্রা শুরু করেছে এশিয়ার শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানির টেলিযোগাযোগ ও ডিজিটাল সেবা প্রতিষ্ঠান জিও প্ল্যাটফর্মস।

ডিজে পারফরম্যান্স, ড্রোন প্রদর্শনী এবং জনপ্রিয় ভারতীয় সংগীতশিল্পীদের পরিবেশনায় উদযাপন করা হয়েছে দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও।

আইপিওর মাধ্যমে ৩২০ কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে জিও। বুধবার শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির পর প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম বেড়েছে ২১ শতাংশ। এতে কোম্পানিটির বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩১৫ কোটি ডলারে।

ভারতের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানির তালিকায় এখন জিওর অবস্থান দ্বিতীয়। শীর্ষে রয়েছে এর মূল প্রতিষ্ঠান আম্বানির রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ।

জিওর বড় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটা ও গুগল। ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠান দুটিই জিওতে কয়েক শ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছিল। বর্তমানে জিওর গ্রাহকসংখ্যা ৫৩ কোটির বেশি।

মুকেশ আম্বানির ছোট ছেলে ও জিওর পরিচালনা পর্ষদের অতিরিক্ত পরিচালক অনন্ত আম্বানি উদযাপন অনুষ্ঠানে বলেন, “জিও হয়তো চোখে দেখা যায় না, কিন্তু ভারতের প্রতিটি ডিজিটাল স্বপ্নের সঙ্গে এটি যুক্ত। আজ জিও ভারতের সবার।”

যেভাবে বাজার বদলে দেয় জিও
২০১৬ সালে ভারতের টেলিযোগাযোগ বাজারে প্রবেশ করে জিও। তখন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গিগাবাইট মোবাইল ডেটার গড় দাম ছিল প্রায় ৭ ডলার। জিও কয়েক মাস বিনা মূল্যে ডেটা ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে প্রতিযোগিতার বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে।

ব্যবসা শুরুর মাত্র ১৭০ দিনের মধ্যে জিওর গ্রাহকসংখ্যা ১০ কোটিতে পৌঁছায়। তখন কোনও মোবাইল অপারেটরের জন্য এত দ্রুত এই মাইলফলক অর্জনের ঘটনা ছিল বিশ্বে নজিরবিহীন। বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে স্পেকট্রাম কেনা, নেটওয়ার্ক ও ফাইবার অবকাঠামো নির্মাণে প্রায় ২ হাজার ২৪৮ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল রিলায়েন্স।

রিলায়েন্সের বিপুল পুঁজির সহায়তায় শুরুতে লোকসান মেনেই গ্রাহক বাড়ানোর কৌশল নেয় জিও। প্রতিযোগীরা বাধ্য হয়ে সেবার দাম কমায়। ফলে ভারতের লাখ লাখ মানুষ প্রথমবারের মতো স্মার্টফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পায়। তিন বছরের মধ্যে গ্রাহকসংখ্যার হিসাবে দেশটির বৃহত্তম টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় জিও।

পরে সিনেমা ও খেলাধুলার সম্প্রচার, ক্লাউড স্টোরেজসহ বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা যুক্ত করে নিজেদের ব্যবসার পরিধি বাড়ায় প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিযোগিতা কমেছে, বেড়েছে বাজারে প্রভাব
জিওর উত্থানে ভারতের টেলিযোগাযোগ খাতে বড় ধরনের মূল্যযুদ্ধ শুরু হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে দেশটিতে গ্রাহকপ্রতি টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানের গড় আয় ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ কমে যায়। এ সময় বাজারে থাকা ১০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সাতটি দেউলিয়া হওয়া কিংবা একীভূত হওয়ার কারণে কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়।

বর্তমানে জিও ও এয়ারটেল শক্ত অবস্থানে রয়েছে। আর্থিক সংকটে থাকা ভোডাফোন আইডিয়াসহ এই তিন প্রতিষ্ঠান ভারতের টেলিযোগাযোগ বাজারের ৯২ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শুরুতে কম দামের সেবা থেকে গ্রাহকেরা সুবিধা পেলেও বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার পর সেই সুবিধা কমতে থাকে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে জিও বিভিন্ন প্যাকেজের দাম ১২ থেকে ২৫ শতাংশ বাড়ায়। অন্য অপারেটররাও পরে দাম বাড়ায়।

স্টারলিংকের সঙ্গে নতুন প্রতিযোগিতা
এবার মহাকাশে নিম্ন কক্ষপথের স্যাটেলাইট ব্যবহার করে ইন্টারনেট সেবা চালুর পরিকল্পনা করছে জিও। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ইলন মাস্কের স্টারলিংকের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামতে হবে প্রতিষ্ঠানটিকে।

ভারতে কার্যক্রম শুরুর অনুমতি পেতে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করছে স্টারলিংক। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে কয়েকটি পোস্টে মাস্ক অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার আম্বানির জিওকে সুবিধা দিতে স্টারলিংকের প্রবেশ আটকে রাখছে। তিনি আম্বানিকে ব্যঙ্গ করে ‘প্রধানমন্ত্রী আম্বানি’ সম্বোধন করেন এবং স্টারলিংককে প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।

মাস্কের অভিযোগ, ভারতের কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নিজেদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে স্টারলিংকের প্রবেশে বাধা দিচ্ছেন। জবাবে রিলায়েন্স বলেছে, তারা কখনও প্রতিযোগিতাকে ভয় পায়নি। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনকে স্বাগত জানানো ভারতের বাজারেই তাদের ব্যবসার বিকাশ ঘটেছে। সূত্র: আল-জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights