টোল রিফাইনিং: ভারত-রাশিয়া জ্বালানি সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে?
অনলাইন ডেস্ক
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং তেল শোধনাগারগুলোর উপর ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন এক বাণিজ্যিক সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে। রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ভারতে এনে শোধন করে সেই পেট্রোল ও ডিজেল আবার রাশিয়ায় ফেরত পাঠানো। জ্বালানি শিল্পে এই ব্যবস্থাকে বলা হচ্ছে ‘টোল রিফাইনিং’। ভারতের বিপুল শোধন ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এই মডেল বাস্তবায়িত হলে একদিকে রাশিয়া তার অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিকল্প ব্যবস্থা পেতে পারে, অন্যদিকে ভারত বিশ্বমানের পরিশোধিত জ্বালানি উৎপাদন ও রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে।
ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশনের সাবেক চেয়ারম্যান শ্রীকান্ত মাধব বৈদ্যর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এই সম্ভাবনা। তবে পরিকল্পনাটির বাস্তবায়ন নির্ভর করবে বাণিজ্যিক লাভ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, পরিবহণ ব্যয় এবং ভারতের নিজস্ব জ্বালানি চাহিদার উপর।
রাশিয়ার জ্বালানি পরিস্থিতি বর্তমানে এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মুখে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত তেল উৎপাদক দেশ হওয়া সত্ত্বেও দেশটির অভ্যন্তরীণ পেট্রোল ও ডিজেলের সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনের ধারাবাহিক হামলায় রাশিয়ার একাধিক তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্টের শেষদিকে প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়ায় দৈনিক পেট্রোল উৎপাদন নেমে এসেছিল প্রায় ৮০ হাজার টনে। অথচ গ্রীষ্মকালীন সময়ে দেশটির দৈনিক চাহিদা ছিল আনুমানিক ১ লক্ষ ১৫ হাজার টন। অর্থাৎ উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান তৈরি হয়েছিল।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতে মস্কো জ্বালানি রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ, বিদেশ থেকে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি বৃদ্ধি এবং ক্ষতিগ্রস্ত শোধনাগার মেরামতের মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কিন্তু এর পাশাপাশি আরও একটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করেও যদি দেশের অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহ করা না যায়, তাহলে বিদেশের শোধনাগার ব্যবহার করে সেই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
এই ধারণার একটি সীমিত উদাহরণ ইতিমধ্যেই মধ্য এশিয়ার কাজাখস্তানে দেখা যাচ্ছে। সেখানে কনডেনসাট শোধনাগারে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াকরণের পরিকল্পনা রয়েছে। উৎপাদিত পেট্রোল ও ডিজেলের প্রায় ৭০ শতাংশ রাশিয়ায় পাঠানোর কথা, আর অবশিষ্ট অংশ কাজাখস্তানে ব্যবহৃত হবে। তবে ছোট আকারের মধ্য এশীয় শোধনাগারগুলি এই ধরনের সরবরাহে কিছুটা সহায়তা করলেও রাশিয়ার বৃহৎ শোধনব্যবস্থায় সৃষ্ট বিঘ্নের বিকল্প হয়ে ওঠার মতো ক্ষমতা তাদের নেই।
এখানেই ভারতের গুরুত্ব সামনে আসছে।
টোল রিফাইনিং ব্যবস্থায় অপরিশোধিত তেলের মালিক সংস্থা অন্য একটি সংস্থার শোধনাগার ভাড়া নিয়ে বা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়াকরণ চুক্তির মাধ্যমে নিজের তেল শোধন করায়। তেলের মালিক অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করে, শোধনাগার নির্ধারিত প্রক্রিয়াকরণ মাশুলের বিনিময়ে সেটিকে পেট্রোল, ডিজেল এবং অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্যে রূপান্তরিত করে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী উৎপাদিত পণ্য এবং তার পরিমাণ নির্ধারিত হয়। শোধনাগার পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি, হাইড্রোজেন, অনুঘটক, প্রক্রিয়াকরণজনিত ক্ষতি এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের হিসাবও এই মাশুলের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
রাশিয়ার ক্ষেত্রে এই মডেল কার্যকর হলে দেশটির কোনও যোগ্য অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী বা সংশ্লিষ্ট সংস্থা ভারতের শোধনাগারে নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতা ব্যবহারের জন্য চুক্তি করতে পারে। রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল ভারতে আসবে, ভারতীয় শোধনাগারে তা প্রক্রিয়াকরণ করা হবে এবং চুক্তি অনুযায়ী উৎপাদিত পেট্রোল ও ডিজেলের একটি নির্ধারিত অংশ রাশিয়ায় ফেরত পাঠানো হবে।
এই ব্যবস্থাকে অনেকটা ট্যাঙ্কার ভাড়া করার সঙ্গে তুলনা করা যায়। তেল পরিবহণের জন্য কোনও সংস্থাকে প্রতিটি জাহাজের মালিক হতে হয় না। প্রয়োজন অনুযায়ী জাহাজের পরিবহণ ক্ষমতা ভাড়া নেওয়া যায়। একইভাবে, নিজস্ব শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা উৎপাদন ব্যাহত হলে কোনও তেল উৎপাদক দেশের পক্ষে বিদেশে নতুন শোধনাগার নির্মাণ না করেও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শোধন ক্ষমতা ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।
রাশিয়ার জন্য এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে জ্বালানি উৎপাদনের ভৌগোলিক ঝুঁকি কমানো। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ভারতীয় শোধনাগার ব্যবহার করে রাশিয়া তার জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় একটি বিকল্প স্তর তৈরি করতে পারে। বিদেশ থেকে একবার পেট্রোল বা ডিজেল কিনে তাৎক্ষণিক ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হলেও, আগে থেকেই নির্দিষ্ট শোধন ক্ষমতার চুক্তি থাকলে ভবিষ্যতের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও পরিকল্পিত ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে।
ভারতের ক্ষেত্রে এই প্রস্তাবের গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ দেশটি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল শোধনকারী রাষ্ট্র। ভারতের মোট শোধন ক্ষমতা প্রায় ২৬৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন প্রতি বছর বা এমএমটিপিএ। আগামী দিনে এই ক্ষমতা আরও বাড়তে চলেছে। চারটি বড় বিদ্যমান শোধনাগার সম্প্রসারণ প্রকল্পের মাধ্যমে নিকট ভবিষ্যতে প্রায় ২৪ এমএমটিপিএ অতিরিক্ত শোধন ক্ষমতা যুক্ত হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
এই সম্প্রসারণ ভারতের নিজস্ব জ্বালানি চাহিদা পূরণের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখানে একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে। দেশের পেট্রোলিয়াম পণ্যের চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়লেও নতুন শোধনাগারের উৎপাদন ক্ষমতা একবারে বড় আকারে যুক্ত হয়। ফলে নতুন ক্ষমতা চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার সম্পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা সব সময় সম্ভব হয় না।
এই ব্যবধানকে কাজে লাগিয়েই টোল রিফাইনিংয়ের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ভারতের আসন্ন ২৪ এমএমটিপিএ অতিরিক্ত শোধন ক্ষমতার মাত্র এক-চতুর্থাংশ, অর্থাৎ ৬ এমএমটিপিএ, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল শোধনে ব্যবহার করা যেতে পারে। অবশ্যই এই ব্যবস্থা বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হতে হবে এবং প্রযোজ্য নিষেধাজ্ঞা ও আইনি বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হবে।
বার্ষিক ৬ এমএমটিপিএ শোধন ক্ষমতা আনুমানিক দৈনিক ১ লক্ষ ২০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াকরণের সমতুল্য। ভারতের মোট স্থাপিত শোধন ক্ষমতার তুলনায় এই পরিমাণ ২.৫ শতাংশেরও কম। কিন্তু রাশিয়ার মতো বৃহৎ তেল উৎপাদক দেশের জন্য দৈনিক ১ লক্ষ ২০ হাজার ব্যারেল বিকল্প শোধন ক্ষমতা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে, বিশেষ করে যখন দেশটির নিজস্ব শোধনাগারগুলিতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
এই ব্যবস্থার জন্য ভারতের শোধন ক্ষমতা স্থায়ীভাবে রাশিয়ার হাতে তুলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং নির্দিষ্ট মেয়াদের চুক্তি করা যেতে পারে। ভারতের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই চুক্তির আওতায় প্রক্রিয়াকরণের পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। ফলে নতুন শোধনাগার চালু হওয়ার পর প্রাথমিক পর্যায়ে যে অতিরিক্ত পরিচালন ক্ষমতা তৈরি হয়, তা থেকে ভারতীয় সংস্থাগুলি আয় করতে পারবে। পরে দেশের চাহিদা বাড়লে সেই ক্ষমতা দেশীয় বাজারের জন্য ব্যবহার করা যাবে।
তবে এই প্রস্তাবের অর্থ এই নয় যে ভারতের শোধনাগারগুলিতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্বৃত্ত ক্ষমতা রয়েছে। বরং ভারতের জ্বালানি চাহিদার প্রবৃদ্ধি এই ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত।
আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা বা আইইএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিশ্বে তেলের চাহিদা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ভারত বৃহত্তম অবদানকারী দেশ হয়ে উঠতে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের তেলের চাহিদা দৈনিক প্রায় ১২ লক্ষ ব্যারেল বাড়তে পারে এবং মোট চাহিদা দৈনিক প্রায় ৬৬ লক্ষ ব্যারেলে পৌঁছতে পারে। এই বৃদ্ধির প্রায় অর্ধেকের সঙ্গে যুক্ত থাকবে ডিজেল বা গ্যাসঅয়েলের চাহিদা। পাশাপাশি বিমান জ্বালানি এবং পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে ব্যবহৃত ফিডস্টকের চাহিদাও বাড়বে।
অর্থাৎ ভারত যে শোধন ক্ষমতা তৈরি করছে, ভবিষ্যতে তার প্রয়োজন হবে। কিন্তু সেই চাহিদা তৈরি হওয়ার আগে নতুন শোধনাগারগুলির কিছু অংশ সাময়িকভাবে অন্য দেশের তেল প্রক্রিয়াকরণে ব্যবহার করা গেলে তা অতিরিক্ত বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি করতে পারে।
ভারত ইতিমধ্যেই বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানি করে। তবে প্রচলিত রপ্তানি ব্যবস্থার সঙ্গে টোল রিফাইনিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। সাধারণত শোধনাগার অপরিশোধিত তেল কিনে, সেটি প্রক্রিয়াকরণ করে এবং পরে উৎপাদিত পণ্যের জন্য ক্রেতা খোঁজে। এই ব্যবস্থায় তেলের দাম, শোধন মার্জিন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির ঝুঁকি বহন করতে হয়।
টোল রিফাইনিংয়ের ক্ষেত্রে গ্রাহক নিজেই অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করে এবং আগেই প্রক্রিয়াকরণের চাহিদা নির্ধারণ করে। ফলে শোধনাগার নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রক্রিয়াকরণ আয়ের নিশ্চয়তা পেতে পারে। অবশ্য প্রকৃত লাভ নির্ভর করবে চুক্তির মাশুল, পরিচালন ব্যয়, পরিবহণ খরচ এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক শর্তের উপর।
এই মডেল ভারতের জন্য আরও একটি বড় কৌশলগত সুযোগ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরেই ভারত নিজেকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিশোধন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। উন্নত প্রযুক্তির শোধনাগার, বিভিন্ন ধরনের অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াকরণের অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক নৌপথের সঙ্গে সংযোগ, বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার এবং সুপ্রতিষ্ঠিত পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানি ব্যবস্থা, সব মিলিয়ে ভারতের হাতে ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে।
আইইএর উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ভারত ছিল বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম মধ্যম পাতনজাত জ্বালানি পণ্য রপ্তানিকারক এবং ষষ্ঠ বৃহত্তম পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য রপ্তানিকারক দেশ। সেই সময় ভারতের মধ্যম পাতনজাত জ্বালানি রপ্তানির পরিমাণ ছিল দৈনিক প্রায় ১২ লক্ষ ব্যারেল।
ভারত যদি টোল রিফাইনিংয়ের মতো ব্যবস্থা কার্যকর করতে পারে, তাহলে তার আন্তর্জাতিক ভূমিকা শুধু পেট্রোল, ডিজেল এবং বিমান জ্বালানি রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দেশটি অপরিশোধিত তেল উৎপাদকদের কাছে শোধন পরিষেবা, অবকাঠামো, সংরক্ষণ, পরিবহণ এবং প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতাও বিক্রি করতে পারবে।
রাশিয়া এই ধারণার প্রথম বড় পরীক্ষাক্ষেত্র হতে পারে। ভবিষ্যতে যেসব তেল উৎপাদক দেশের নিজস্ব শোধন ক্ষমতা অপর্যাপ্ত, যেসব দেশে শোধনাগার মেরামতের জন্য বন্ধ রাখতে হয়, অথবা যেসব সংস্থার সাময়িকভাবে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতা প্রয়োজন, তারাও এই ধরনের ব্যবস্থার সম্ভাব্য গ্রাহক হতে পারে।
তবে রাশিয়ার সঙ্গে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাধা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা।
রাশিয়ার তেল ও জ্বালানি খাতকে ঘিরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আর্থিক বিধিনিষেধের কারণে কোনও চুক্তি করার আগে প্রতিটি দিক সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করতে হবে। চুক্তির অপর পক্ষের পরিচয়, অপরিশোধিত তেলের মালিকানা, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বিমা, জাহাজ চলাচল, জাহাজের মালিকানা এবং উৎপাদিত পণ্যের চূড়ান্ত গন্তব্য, প্রতিটি বিষয়ই আইনি যাচাইয়ের আওতায় আনতে হবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও লেনদেনের উপর প্রযোজ্য নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে এমন কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না।
একই সঙ্গে ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। ভারত দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভারতীয় শোধনাগারগুলিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াকরণ করা হয়েছে। ভারতের নিজস্ব আইন, অংশগ্রহণকারী সংস্থাগুলির উপর প্রযোজ্য বাধ্যবাধকতা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা মেনে যদি কোনও চুক্তি বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হয়, তাহলে সেই সুযোগ বিবেচনা করার অধিকার ভারতের নিজস্ব নীতিগত সিদ্ধান্তের অংশ।
তবে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের অর্থ এই নয় যে বাণিজ্যিক ঝুঁকি উপেক্ষা করা হবে। একটি নির্দিষ্ট চুক্তি থেকে যে মুনাফা আসবে, তা যদি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক ব্যবসা, আর্থিক লেনদেন বা জ্বালানি রপ্তানির ক্ষেত্রে গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে, তাহলে সেই চুক্তি গ্রহণ করা যুক্তিযুক্ত হবে না। তাই এই ধরনের পরিকল্পনায় বাণিজ্যিক উদ্ভাবনের পাশাপাশি আইনি সতর্কতা অপরিহার্য।
আরও একটি প্রশ্ন উঠতে পারে। রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ভারতে আসবে, এখানে শোধিত হবে এবং তারপর পেট্রোল ও ডিজেল আবার হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে রাশিয়ায় ফিরে যাবে। পরিবহণের এই অতিরিক্ত খরচ কি আদৌ অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিযুক্ত?
এর উত্তর নির্ভর করবে পরিস্থিতির উপর। রাশিয়ার শোধনাগারগুলি স্বাভাবিকভাবে কাজ করলে দেশটির অভ্যন্তরেই তেল শোধন করা ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে বেশি সুবিধাজনক। কিন্তু যখন শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, উৎপাদন কমে যায় এবং দেশের বাজারে জ্বালানির ঘাটতি তৈরি হয়, তখন হিসাবটি বদলে যায়।
সেই পরিস্থিতিতে তুলনা করতে হবে ভারতের শোধন মাশুল এবং পরিবহণ ব্যয়ের সঙ্গে রাশিয়ার হারানো উৎপাদন, জরুরি পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি, অভ্যন্তরীণ ঘাটতি এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকির মোট ব্যয়। যদি বিদেশে শোধন করানোর মোট খরচ এই বিকল্পগুলির তুলনায় কম হয়, তাহলে দীর্ঘ দূরত্বে তেল পরিবহণ সত্ত্বেও টোল রিফাইনিং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই ধারণার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক তেলের সরবরাহ শুধু উৎপাদনকারী দেশের উপর নির্ভর করে না। যুদ্ধ, শোধনাগারের ক্ষতি, সামুদ্রিক পরিবহণের ঝুঁকি, নিষেধাজ্ঞা এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অস্থিরতা, সবই জ্বালানি সরবরাহ ও দামের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। অপরিশোধিত তেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও যদি তা থেকে পেট্রোল ও ডিজেল উৎপাদন করা না যায়, তাহলে বাজারে সংকট দেখা দিতে পারে। রাশিয়ার অভিজ্ঞতা সেই সমস্যারই একটি উদাহরণ।
