ট্রাম্প-শি বৈঠকের সপ্তাহখানেক পরেই তাইওয়ানে মার্কিন এফ-১৬ভি যুদ্ধবিমান

চীনের ক্রমাগত সামরিক হুমকি ও নিত্যদিনের আকাশসীমা লঙ্ঘনের কঠোর জবাব দিতে নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে তাইওয়ান। কয়েক মাসের দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কেনা ৬৬টি নতুন এফ-১৬ভি ব্লক ৭০ যুদ্ধবিমানের প্রথম দুটি শুক্রবার তাইওয়ানে এসে পৌঁছেছে।

গণতান্ত্রিকভাবে শাসিত এই দ্বীপরাষ্ট্রটিকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে আসছে বেইজিং। এমন প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সমর্থক ও অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এই সামরিক সরঞ্জাম লাভ তাইওয়ানের প্রতিরক্ষায় বড় ধরনের অগ্রগতি বলে মনে করা হচ্ছে।

তাইওয়ানের পাহাড়ি পূর্ব উপকূলের তাইতুংয়ে অবস্থিত চিহাং বিমানঘাঁটিতে এই দুই অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান অবতরণ করে। বিমান দুটি হাওয়াই ও গুয়াম হয়ে স্থানীয় সময় দুপুর ১২টায় (গ্রিনিচ মান সময় ০৪:০০ টা) উক্ত ঘাঁটিতে পৌঁছায়। ওয়াশিংটন তাদের নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে দাবি করলেও, তাইপেতে মার্কিন ট্রাম্প প্রশাসনের অস্ত্রসহায়তা অব্যাহত রাখা নিয়ে সংশয়ের মাঝেই এই যুদ্ধবিমানগুলো সরবরাহ করা হলো।

বিমানগুলো অবতরণের কিছুক্ষণ আগে তাইপের সংসদে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েলিংটন কু জানান, খুব শিগগিরই আরও একাধিক নতুন এফ-১৬ভি তাইওয়ানে এসে পৌঁছাবে। তবে বিস্তারিত তথ্য না দিয়ে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, বছরের শেষ নাগাদ শুধুমাত্র এই দুটি বিমানের সরবরাহের ওপরই তাদের নির্ভর করতে হবে না, আরও চালান আসবে।

উল্লেখযোগ্য যে, ২০১৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লকহীড মার্টিনের তৈরি এসব এফ-১৬ভি যুদ্ধবিমান তাইওয়ানের কাছে বিক্রির জন্য ৮ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি অনুমোদন করে। এই চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নে তাইওয়ানের বহরে মোট এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে যাবে। তবে সফটওয়্যারজনিত সমস্যা সহ নানা কারণে দীর্ঘদিন ধরে এই অত্যাধুনিক বিমানগুলোর সরবরাহ বিলম্বিত হচ্ছিল।

এই প্রথম দুটি যুদ্ধবিমানের আগমন ঘটল এমন একসময়ে, যার ঠিক এক সপ্তাহ আগে ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর আগে গত মে মাসে বেইজিংয়ে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ট্রাম্প তাইওয়ানের জন্য নির্ধারিত ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি নতুন অস্ত্র প্যাকেজ স্থগিত রাখার কথা ঘোষণা করেছিলেন, যদিও এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি ১১ বিলিয়ন ডলারের আরেকটি অনুমোদন দিয়েছিলেন।

মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ধারণার উদ্ধৃতি দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ২০২৮ সালের আগে চীনের তাইওয়ান আক্রমণের সম্ভাবনা ক্রমশ কমে আসছে বলে ওয়াশিংটন মনে করে। কাকতালীয়ভাবে, ২০২৮ সালের শুরুতেই তাইওয়ানে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তবে চীন সরকারের আগ্রাসী মানসিকতা প্রসঙ্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েলিংটন কু স্পষ্ট ভাষায় বলেন, শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তাইওয়ান দখল করার যে দূরভিসন্ধি চীনের রয়েছে, তা কখনো পরিবর্তিত হয়নি।

নতুন সরবরাহ করা এফ-১৬ভি যুদ্ধবিমানগুলোতে রয়েছে আধুনিক এভিয়েনিক্স, অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র এবং উন্নত রাডার সিস্টেম। এটি চীনা বিমানবাহিনীর বিশেষ করে তাদের দূরপাল্লার ‌‘জে-২০’ স্টিলথ ফাইটার জেটগুলোর মুখোমুখি লড়াইয়ে তাইওয়ানকে বিশেষ সুবিধা দেবে।

উল্লেখ্য, ওয়াশিংটন তাইওয়ানকে নিজেদের সবচেয়ে উন্নত এফ-২২ বা এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান দিতে সম্মত না হওয়ায় এফ-১৬ভি সরবরাহকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া তাইওয়ানের হাতে থাকা পুরোনো এফ-১৬ বিমানগুলোর আধুনিকায়ন কার্যক্রম ২০২৩ সালেই সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

আইনগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে আত্মরক্ষার স্বাবলম্বী সরঞ্জাম সরবরাহ করতে বাধ্য থাকলেও দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। অন্যদিকে, বেইজিং শুরু থেকেই ওয়াশিংটনকে তাইওয়ানকে অস্ত্র সরবরাহ অবিলম্বে বন্ধ করার তাগিদ দিয়ে আসছে। নতুন এফ-১৬ভি ফাইটার জেট পৌঁছানোর বিষয়ে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

তবে সার্বিক বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের একজন মুখপাত্র বলেন, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে নিজেদের যৌথ সমৃদ্ধি, নিরাপত্তা এবং মূল্যবোধ এগিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্র তার বন্ধু ও সহযোগীদের পাশে অবস্থান অব্যাহত রাখবে—যার মধ্যে তাইওয়ানও অন্তর্ভুক্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights