ডেঙ্গুতে ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর

জয়শ্রী ভাদুড়ী

সেপ্টেম্বরজুড়ে তাণ্ডব চালিয়েছে ডেঙ্গুজ্বর। গত বছরের তুলনায় এ বছর সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার দ্বিগুণ। এডিস মশার কামড়ে প্রাণহানিতে এ মাস পরিণত হয়েছে ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরে। ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় অক্টোবর নিয়েও রয়েছে শঙ্কা। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে অক্টোবরেও ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন কীটতত্ত্ববিদরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, এ বছরের সেপ্টেম্বরে ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ মাসে মৃত্যু হয়েছে ১৪৮ জনের। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১৫ হাজার ৮৬৬ জন এবং মারা গিয়েছিলেন ৭৬ জন।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক বছরের ব্যবধানে সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে ২৭ হাজার ৯০৮ জন। বৃদ্ধির হার প্রায় ১৭৬ শতাংশ। একই সময়ে মৃত্যু বেড়েছে ৭২ জন, যা প্রায় ৯৫ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় এ বছরের সেপ্টেম্বরে আক্রান্ত প্রায় ২ দশমিক ৮ গুণ এবং মৃত্যু প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১৮ হাজার ৯৭ জন, মারা গিয়েছিলেন ৮০ জন।

চলতি বছরের মাসভিত্তিক হিসাবেও সেপ্টেম্বরের তীব্রতা স্পষ্ট। জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৩৫ হাজার ৮৪৬ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেও সেপ্টেম্বরে এক মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন। ফলে বছরের মোট আক্রান্ত ৭৯ হাজার ৬২০ জনে দাঁড়িয়েছে। সেপ্টেম্বরের ১৪৮ মৃত্যু নিয়ে এ বছর মোট মৃত্যুও ২৪৫ জনে পৌঁছেছে।

ডেঙ্গুর তীব্রতায় সরকারি পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এডিস মশার বংশবিস্তার নির্মূলে সরকার সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছে। ডেঙ্গু একটি মশাবাহিত রোগ। পৃথিবীতে এর আলাদা কোনো চিকিৎসা নেই। নির্দিষ্ট চিকিৎসা প্রটোকল রয়েছে। সে চিকিৎসা প্রটোকল দেশের সব উপজেলা পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্লাজমা লিকেজ এড়াতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের জ্বর কমে যাওয়ার পর চার দিন গুরুত্ব দিয়ে হাসপাতালে অবজারভেশনে রাখতে হবে। রোগীরা চলে যেতে চাইলেও যেতে দেওয়া যাবে না। প্রয়োজনীয় স্যালাইন প্রতিটি উপজেলায় ও কেন্দ্রে পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুত রাখা হয়েছে। চিকিৎসায় কোনো কিছুর অভাব হবে না।’

ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় অক্টোবর নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। কীটতত্ববিদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কবিরুল বাশারের পূর্বাভাস মডেলে অক্টোবরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমাদের ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় তাই একটি মৌলিক পরিবর্তন দরকার, অভিযান থেকে ব্যবস্থাপনা, প্রতিক্রিয়া থেকে আগাম প্রস্তুতি এবং মশা নিধন থেকে মশার উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের দিকে যেতে হবে। সমন্বিত ভেক্টর ব্যবস্থাপনার আওতায় পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ, প্রয়োজন অনুযায়ী লার্ভিসাইডিং ও পূর্ণবয়স্ক মশা নিয়ন্ত্রণ, ব্যক্তিগত সুরক্ষা এবং নতুন প্রযুক্তিকে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করতে হবে। তিনি বলেন, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এখন দরকার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছার পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক শৃঙ্খলা। দরকার গবেষণা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ, সিটি করপোরেশন, স্থানীয় প্রশাসন এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়। দরকার এমন একটি জাতীয় ব্যবস্থা, যেখানে রোগীর তথ্য এবং মশার তথ্য পাশাপাশি বিশ্লেষণ করা হবে এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ডেঙ্গু কোনো আকস্মিক দুর্যোগ নয় যে, প্রতি বছর তা মোকাবিলায় আমাদের কেবল জরুরি অভিযান চালাতে হবে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সমস্যা, যার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দরকার।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বরকে ডেঙ্গুর ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ফলে সেপ্টেম্বরের মতো অক্টোবরেও রোগীর চাপ বাড়লে হাসপাতালগুলোতে শয্যা ও চিকিৎসাসেবার ওপর আরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সিটি করপোরেশন একদিকে বিকালে ফগিং মেশিন দিয়ে ধোঁয়া দিচ্ছে, সকালে লার্ভিসাইড (মশার ওষুধ) প্রয়োগ করছে। আরেকদিকে প্রতি বছর ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগী বাড়ছে। তাই লোক দেখানো ধোঁয়া দিয়ে হবে না, লার্ভিসাইড বাজারে উন্মুক্ত করে দিতে হবে। যাতে মানুষ কিনে জমে থাকা পরিষ্কার পানিকে প্রয়োগ করতে পারে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভার অপ্রতুল পরিচ্ছন্নতাকর্মী দিয়ে ডেঙ্গুর তাণ্ডব ঠেকানো যাবে না। এজন্য জনগণকে সঙ্গে নিয়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এতে তারাও কোথায় পানি জমে এবং কীভাবে পরিষ্কার করতে হয় তা শিখতে পারবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights