দুই শতকের ঐতিহ্য, তুলশীগঙ্গা তীরে জমেছে সন্ন্যাসতলীর ঘুড়ির মেলা

জয়পুরহাট প্রতিনিধি

জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার তুলশীগঙ্গা নদীর তীরে সন্ন্যাসতলা মন্দিরসংলগ্ন এলাকায় শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী সন্ন্যাসতলীর ঘুড়ির মেলা। মধুমাস জ্যৈষ্ঠের শেষ সময়ে আয়োজিত এই মেলাকে ঘিরে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়। নানা বয়সী মানুষের অংশগ্রহণে মেলাটি পরিণত হয়েছে এক মিলনমেলায়।

মেলার সঠিক ইতিহাস জানা না গেলেও জনশ্রুতি রয়েছে, সন্ন্যাসী পূজাকে কেন্দ্র করে দুই শতাব্দীরও বেশি আগে এ মেলার সূচনা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও শুক্রবার শুরু হওয়া মেলা শনিবার পর্যন্ত চলে।

মেলাকে কেন্দ্র করে ক্ষেতলাল উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। প্রতিবছরের মতো এবারও বাড়ি বাড়ি আত্মীয়স্বজন, বিশেষ করে জামাই-মেয়ের আগমন ঘটে। মেলার আগের দিন থেকেই ব্যবসায়ীরা তাদের পসরা সাজিয়ে বসেন।

প্রায় চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বসা মেলায় দেখা গেছে নানা ধরনের ঘুড়ি, মৌসুমি ফল, মিষ্টান্ন এবং গ্রামীণ জীবনের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রী। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে ছিল বাঁশের তৈরি রঙিন ডালা, কুলা, চাঙ্গারি, হাতপাখা, মাছ ধরার উপকরণ ও বিভিন্ন গৃহস্থালি সামগ্রী।

ক্ষেতলাল উপজেলা সদর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দক্ষিণে মামুদপুর ইউনিয়নের মহব্বতপুর-জিয়াপুর গ্রামের তুলশীগঙ্গা নদীর তীরে বসে এই ঐতিহ্যবাহী মেলা। শনিবার সকালে সনাতন ধর্মাবলম্বী নারীরা মেলায় এসে সন্ন্যাস-ঠাকুরের পূজা-অর্চনায় অংশ নেন। একই সময়ে আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্কদের মধ্যে চলে ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব।

কোনো আনুষ্ঠানিক পুরস্কারের আয়োজন না থাকলেও ঘুড়ি কত উঁচুতে উড়বে কিংবা কার ঘুড়ির সুতা কে কাটতে পারে—এসব নিয়েই দিনভর চলে আনন্দঘন প্রতিযোগিতা।

স্থানীয় বাসিন্দা মহসিন আলী ও তোফাজ্জল হোসেন বলেন, তাদের পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই এ মেলার আয়োজন হয়ে আসছে। শুধু স্থানীয় মানুষ নয়, আশপাশের জেলা থেকেও বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী ও ক্রেতা মেলায় আসেন।

মেলায় আসা বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার নাসির হোসেন ও দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার আরমান হোসেন বলেন, প্রতিবছর তারা মূলত ঘুড়ি কিনতেই এই মেলায় আসেন। তবে এখানে ঘুড়ির পাশাপাশি নানা ধরনের প্রয়োজনীয় সামগ্রীও পাওয়া যায়।

সন্ন্যাস পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সভাপতি মন্টু চন্দ্র বলেন, প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এই মেলা হিন্দু-মুসলিম সবাই মিলে আয়োজন ও পরিচালনা করেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীরাও এতে অংশ নেন।

সন্ন্যাসতলী মেলা কমিটির সভাপতি আলী হাসান রিপন বলেন, এই মেলার প্রধান আকর্ষণ ঘুড়ি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি শুধু একটি ধর্মীয় বা গ্রামীণ মেলা নয়, বরং সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights