নারীর ঘামে চলছে সংসার
সাইফ ইমন
রাজধানীর আফতাবনগরের বাসিন্দা জারিনা বেগম, বয়স ৪২। নিজ এলাকার আড্ডার মোড় নামক স্থানে সন্ধ্যা হলেই দেখা যায় সিদ্ধ ডিম বিক্রির পসরা সাজিয়ে বসেছেন তিনি। ক্রেতাও অনেক। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে ক্রেতার সংখ্যা। এক ধরনের বিশেষ মসলা ব্যবহার করেন তিনি সিদ্ধ ডিমের সঙ্গে। এভাবেই জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে তাঁর। তবে তাঁর চলার পথটা মোটেই সুগম ছিল না। স্বামীর কথা জানতে চাইলে চুপ করে থাকেন। তবে স্বামীর থাকা না থাকায় কিছু নির্ভর করে না জরিনা বেগমদের। আপন শক্তিতে সমাজে এখন তৈরি হয় অসংখ্য নারী উদ্যোক্তা। যাদের মেধা আর পরিশ্রমের ঘামে চলছে অনেক সংসার। তাদের আয়ে চিকিৎসা হচ্ছে পরিবারের অসুস্থ সদস্যদের।
বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জরিনা বেগম বলেন, আমার সন্তানদের নিয়ে মোটামোটি সচ্ছল এখন, পরিবার চালিয়ে নিতে পারছি। এক সময় খুব অভাব ছিল সংসারে। একদিন কিছু টাকা জমা করে শুরু করি সিদ্ধ ডিমের ব্যবসা। ঘরে বানানো মসলা মাখিয়ে তা বিক্রি শুরু করি। এরপর থেকে আস্তে আস্তে এই মসলা মাখা সিদ্ধ ডিম সবার প্রিয় হয়ে উঠেছে। দেখা যায় ডিম বিক্রির পাশেই নারিকেল আর ডাবও বিক্রি শুরু করেছেন তিনি। এতেও আয় বেড়েছে।
জরিনা বেগমের ভ্রাম্যমাণ দোকান থেকে একটু সামনে এগিয়ে গেলেই চোখে পড়ে তিন থেকে চারজন নারী বিক্রি করছেন তরিতরকারি। প্রতিদিন তারা এখানে আসেন সবজি বিক্রি করতে। এদের কেউ ঘরে ফেলে এসেছেন পঙ্গু স্বামী, কেউ আবার সঙ্গে নিয়ে এসেছেন সন্তানকে। বিলকিস বেগম তাদের একজন। তিনি বলেন, মেয়েকে নিয়ে এসেছি আজকে। শরীরটা ভালো যাচ্ছে না ঈদের পর। এখানে সবজি বিক্রি করে আমাদের সংসার চলে তাই শরীর খারাপ নিয়েও আমাদের কাজে আসতে হয় নইলে চুলা জ্বলবে না। বণশ্রী, নন্দীপাড়া, ত্রিমোহনী থেকেও নারীরা আসেন তাদের উঠোনে চাষ করা সবজি নিয়ে। ফাতেমা বেগম থাকেন ত্রিমোহনী। তিনি জানান, ভিটের পাশে করেছেন গোয়াল ঘর। দীর্ঘদিন থেকে লালনপালন করছেন একটি গাভি। প্রতিদিন দুধ নিয়ে এসে বসে যান বনশ্রী আইডিয়াল স্কুলের সামনে। রামপুরা ব্রিজে মেরুল বাড্ডার পাশে প্রতিদিন পান-সিগারেট বিক্রি করতে বসেন নাসরীন আক্তার। তিনি বলেন, স্বামী কিছু করে না। কোনোদিন আয় করে কোনোদিন করে না। ফলে বিয়ের পর অনেক দিন না খেয়ে থাকতে হয়েছে। তিনি বলেন, খাবারের কষ্ট অনেক সহ্য করা যায় না। এক সময় কষ্ট করে টাকা জমিয়ে শুরু করি এই ব্যবসা। আল্লাহর রহমতে এখন আর না খেয়ে থাকতে হচ্ছে না। সমাজের কোথাও আজ আর থেমে নেই নারীরা। এগিয়ে চলছে সগৌরবে। অসহায় অবলা ইত্যাদি বিশেষণ এখন আর খাটে না সমাজের সুবিধাবঞ্চিত নারীদের পাশে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালমা আক্তার বলেন, সমাজে নারীরা এখন নিজের পায়ে দাঁড়ানো শিখেছেন। কারও অপেক্ষা বা সাহায্যের আশায় না থেকে বর্তমানে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাই হয়ে উঠেছেন উদ্যোক্তা। দর্জি বা সেলাই কাজ, নকশিকাঁথা, শাড়ি-কাপড়, রূপসজ্জা, গৃহসজ্জা, বেকারি ও হোমমেড ফুড এবং অনলাইন ই-কমার্স সবখানেই এখর নারীদের জয়জয়কার। তাদের ভবিষ্যৎ এত দীর্ঘমেয়াদি সুফল বয়ে আনবে সমাজে। পরিবারের ছোটদের শিশুশ্রমের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে নারীদের এই উদ্যোক্তা হওয়া অনেক কাজে আসবে। বেশি বেশি করে কর্মক্ষম এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমরা সমাজের সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যেতে ক্ষুদ্র নারী ব্যবসায়ীদের তুলে ধরতে হবে।
