নাশকতায় জড়িত নিষিদ্ধরা

ইমরান রহমান
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে টানা চার দিনের আন্দোলনে গতকাল ঢাকা, গাজীপুর ও সাভারে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। পোশাকশ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পল্লবীতে পুলিশের গাড়িতে ও গাজীপুরে পুলিশ বক্সে আগুন দিয়েছে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ার শেল, জলকামান ব্যবহার করেছে। গতকাল সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত এসব এলাকায় নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এসব ঘটনায় জড়িত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ৩০ নেতা-কর্মীকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। শ্রমিকদের বিক্ষোভের মুখে ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ এবং সাভার-আশুলিয়া ও জিরানীসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ৫২৯টি পোশাক কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী তার নির্ধারিত সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর বাতিল করেছেন। এদিকে, পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বাড়াতে ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার।

গোয়েন্দারা বলছেন, পোশাকশ্রমিকদের দাবি-দাওয়াকে সামনে রেখে নৈরাজ্যের সৃষ্টি করেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা। শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছেন দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা। সাধারণ শ্রমিকদের এই যৌক্তিক আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত ও দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে সরকারি দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছেন। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, কয়েকটি রাজনৈতিক সংগঠন পরিকল্পিতভাবে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে। সরকারকে অস্থিতিশীল করা ও জনগণের দুর্ভোগ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে একটি মহল পরিকল্পিতভাবে শ্রমিকদের রাস্তায় নামিয়েছে। ইন্ডাস্ট্রি অল বাংলাদেশ কাউন্সিল (আইবিসি) সভাপতি মীর আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, চলমান শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে বাইরের রাজনৈতিক দলের ইন্ধন এবং কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের উসকানি রয়েছে।

৩০ আওয়ামী নেতা-কর্মী আটক : পুলিশের গাড়িতে ও পুলিশ বক্সে অগ্নিসংযোগ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, কারখানায় ভাঙচুর, সড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগসহ নানা সহিংস ঘটনায় উসকানি ও ইন্ধনদাতা হিসেবে উঠে এসেছে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের অর্ধশতাধিক নেতা-কর্মীর নাম। ইতোমধ্যে মিরপুরে নাশকতা চালানোর সময় নিষিদ্ধ সংগঠনটির বিভিন্ন পর্যায়ের ৩০ নেতা-কর্মীকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১ জনকে আটক করে ডিবি পুলিশ। তারা হলেন মো. কামাল গাজী, মো. ওলিউল্লাহ অনিক, আলিফ হোসেন ইমন, আরিফ আকন্দ, জায়েদ করিম জিয়াদ, মোয়াজ্জেম শাহরিয়া (নিয়াজ), জুবায়েদ ইসলাম জিসান, মো. নাহিদ হাসান, মাহিম মোল্লা, আরিফ ও রমজান সরকার। থানা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার ১৯ জনের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হয়নি। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, মিরপুরে নাশকতা চেষ্টায় শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে ২ শতাধিক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী। এদের আগের রাতেই গেরিলা-৭১ ও প্রজন্ম ৭১ নামে দুটি ওয়াটসআপ ও টেলিগ্রাম গ্রুপে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

মিরপুরে নাশকতায় ২০ ইন্ধনদাতা ও সমন্বয়ক : গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, মিরপুরে নাশকতায় সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন, মিরপুরের সাবেক এমপি ইলিয়াস মোল্লার ভাগনে আলিফ, যুবলীগ নেতা তাজুল ইসলাম বাপ্পি ও মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের মামুন।

এ ছাড়া ইন্ধনদাতা হিসেবে কাজ করেন পল্লবী থানা যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানা, ৯২ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের আহ্বায়ক আলিফ মোল্লা, রূপনগর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাকিল আহমেদ শুভ, পল্লবী থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জুনায়েদ হোসেন নাহিদ, ৫ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের আহ্বায়ক বোতা খলিল, ৫ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের ১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক কামাল হাওলাদার, ৫ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক রুবেল রানা, ৯১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শামীম গাজী, ৯১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক লতিফ, ৯১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ যুগ্ম আহ্বায়ক শিমুল মোল্লা, ৫ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক জাহিদ মুন্সী, ৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা মীর রকি, ৯২ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা আসলাম ও কাতল, ২ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ছোট সেলিম, ৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের রনি, ৯১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আনোয়ার। তাদের অনেকেই দেশের বাইরে পলাতক রয়েছেন।

ডিবি মিরপুর বিভাগের ডিসি মোহাম্মদ রাকিব খান জানান, আন্দোলনকে পুঁজি করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও নাশকতার চেষ্টা করছেন নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা। মিরপুর ১০ ও এর আশপাশ এলাকায় অভিযানে গ্রেপ্তাররা বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার, গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলার তৃণমূল নেতা। তারা মাস্ক পরা ছিলেন। নাশকতার পর নিষিদ্ধ দলের মিছিল করার পরিকল্পনা ছিল তাদের। মিরপুরের পলাতক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার ভাগনে আলিফ মোল্লা মূলত এ নাশকতার সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেন। মিরপুর বিভাগের ডিসি হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার জানান, আটক ১৯ জনের বিষয়ে যাচাইবাছাই চলছে। অগ্নিসংযোগ ও সংঘর্ষের ঘটনায় মামলা দায়ের করা হবে।

মিরপুরে পুলিশের গাড়িতে আগুন, সংঘর্ষ : গতকাল রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরসহ আশপাশের এলাকায় পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। সংঘর্ষের সময় পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এ সময় শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান নিক্ষেপ করেছে। পরে পোশাকশ্রমিকরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল ৯টার দিকে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে বিভিন্ন দিক থেকে পোশাকশ্রমিকরা মিছিল নিয়ে আসতে থাকেন। একপর্যায়ে তারা সাড়ে ৯টার দিকে রাস্তা অবরোধ করেন। বেলা ১১টার দিকে পুলিশ তাদের রাস্তা ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করলে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন শ্রমিকরা। পুলিশকে ভুয়া ভুয়া স্লোগান দিতে থাকেন। বেলা সোয়া ১১টার দিকে বিপুল সংখ্যক পুলিশ শ্রমিকদের ধাওয়া দেওয়া শুরু করে। শুরু হয় দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। শ্রমিকরা রাস্তার পাশের বিভিন্ন দোকান ভাঙচুর করেন। এ সময় তারা যমুনা ব্যাংকের গ্লাসও ভেঙে ফেলেন। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিতে মুহুর্মুহু টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড, জলকামান নিক্ষেপ করে। প্রায় ঘণ্টাখানেক চলে এ সংঘর্ষ। পুলিশের সামনে টিকতে না পেরে শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। মিরপুর-১০ এর নিয়ন্ত্রণ নেয় পুলিশ। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ওই এলাকায় সীমিত আকারে যানচলাচল শুরু হয়। দুপুর সাড়ে ১২টার পর শ্রমিকরা মিরপুর-১১ এর দিকে এসে সংগঠিত হয়। এ সময় তারা মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে থাকা পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি এলে সেই গাড়িকেও ধাওয়া করেন পোশাকশ্রমিকরা। এমন অবস্থায় পুলিশ আবারও অ্যাকশনে যায়। শুরু হয় দুই পক্ষের সংঘর্ষ। পুলিশ পোশাকশ্রমিকদের রাস্তা থেকে সরাতে দফায় দফায় টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। দুপুর ২টার দিকে পুলিশি অ্যাকশনে পিছু হটেন পোশাকশ্রমিকরা। এদিকে ৪ ঘণ্টারও বেশি সময় চলা এ সংঘর্ষে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। বিশেষ করে সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে যারা অফিসসহ অন্যান্য কাজে সকালে বেরিয়েছেন তাদের ব্যাপক ভোগান্তি পোহাতে হয়। অনেককে হেঁটে অফিস ও নিজ নিজ গন্তব্যে যেতে হয়। দুপুর ২টার সব সড়কেই যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

গাজীপুরে পুলিশ বক্সে আগুন, অবরোধ : এদিকে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গতকাল দিনভর উত্তপ্ত পরিস্থিতি ছিল। শ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কোনাবাড়ী থেকে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পর্যন্ত ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় যমুনা ব্যাংক, বিভিন্ন পোশাক কারখানার ফটক, মৌচাক কাটার পুলিশ বক্স এবং কোনাবাড়ী পুলিশ বক্সে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়। একপর্যায়ে কোনাবাড়ী পুলিশ বক্সে এবং আনসার একাডেমির সামনে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। পরে পুলিশ, বিজিবি ও অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করেছে পুলিশ। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা পর দুপুর আড়াইটার দিকে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকালে কালিয়াকৈরের রতনপুর এলাকার করনী নিট কম্পোজিট, নিট এশিয়াসহ আশপাশের কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ দিয়ে সফিপুর বাজার এলাকায় মহাসড়কে অবস্থান নেন। কারখানায় হাজিরা দেওয়ার পর তারা লাঠিসোঁটা হাতে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে চন্দ্রা, পল্লীবিদ্যুৎ, সফিপুর, মৌচাক, কোনাবাড়ি ও কাশিমপুর এলাকার শ্রমিকরা মহাসড়কে জড়ো হন। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনে শ্রমিকের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বেতন বাড়ানোর দাবিতে কয়েক হাজার শ্রমিক ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে অবস্থান নিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করেন। সড়কের মাঝখানে কাঠের বিভিন্ন জিনিসপত্রে আগুন ধরিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন তারা। একপর্যায়ে মহাসড়কের ভোগড়া বাইপাস থেকে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পর্যন্ত দুই পাশের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। আটকা পড়েন দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রীরা। এদিকে আন্দোলন চলাকালে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় ট্রপিক্যাল নিটেক্স লিমিটেড নামের একটি কারখানার ঝুট গুদামে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। শ্রমিকরা ফায়ার সার্ভিসকে সেখানে যেতে দিতে চাননি। কীভাবে সেখানে আগুন লেগেছে সেটিও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট, চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। শ্রমিক বিক্ষোভের কারণে এসব এলাকার অধিকাংশ কারখানা ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। বিক্ষোভকারীদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এতে বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন দিকে ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি বিজিবি এবং টাঙ্গাইল থেকে আসা পুলিশের অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা হয়। সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা ভোগান্তির পর স্বস্তি ফিরে পান যাত্রীরা। নতুন করে যাতে শ্রমিকরা কোনো নৈরাজ্য করতে না পারেন সেজন্য চন্দ্রা, পল্লীবিদ্যুৎ, সফিপুর, মৌচাক ও কোনাবাড়ীসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে।

গাজীপুর শিল্পপুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন বলেন, শ্রমিকরা মহাসড়ক ছেড়ে চলে যাওয়ায় মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। আশপাশের পরিস্থিতিও স্বাভাবিক আছে।

নাশকতায় জড়িত নিষিদ্ধরা

সাভার আশুলিয়ায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া : অন্যদিকে গতকাল সকালের দিকে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকার আল-মুসলিম অ্যাপারেলস, নিউএইজ গ্রুপ ও ট্রাউজার লাইন লিমিটেডের শ্রমিকরা কারখানায় প্রবেশ করে কাজ বন্ধ রেখে সড়কে অবস্থান নেন। পরে পৌনে ১১টার দিকে আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকায় শারমিন গ্রুপের সামনে বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়কে অবস্থান নেন কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা। একপর্যায়ে অন্যান্য কারখানার শ্রমিকদের সংহতি জানানোর আহ্বানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অনন্ত গার্মেন্টসের সামনে শ্রমিকরা সড়ক আটকে অবস্থান নিলে নিবৃত্ত করার চেষ্টাকালে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিং করে শ্রমিকদের শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়। আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশের এসপি মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, শ্রমিক অসন্তোষের মুখে নিরাপত্তাজনিত কারণে আশুলিয়ার অর্ধশতাধিক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে এবং মাঠে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

পোশাকশ্রমিকদের জন্য সরকারি মজুরি বোর্ড গঠন : পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বাড়াতে ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। সরকার, মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি চূড়ান্ত করে এই বোর্ড গঠন করা হয়েছে। সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। গতকাল এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া এই মজুরি বোর্ডে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে আছেন-পোশাকমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ পরিচালক এ বি এম সামছুদ্দিন ও বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব। বোর্ডে শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাংলাদেশ গার্মেন্ট অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশন (বিজিআইডব্লিউএফ) সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইন এবং নিরপেক্ষ প্রতিনিধি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ।

মজুরি বোর্ডের সদস্যদের দ্রুত মজুরি ঘোষণা করার আহ্বান জানিয়ে শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, যারা মজুরি বোর্ডের সদস্য হয়েছেন তাদের প্রতি আহ্বান থাকবে, দ্রুত তারা মজুরি ঘোষণা করবেন।

পরিস্থিতির উন্নতি না হলে কারখানা বন্ধ রাখা হবে : পোশাকশিল্প এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে কারখানা বন্ধ রাখা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু। তিনি গতকাল বিজিএমইএর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এ কথা জানান। বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, আমাদের প্রতিটি সদস্য প্রতিদিন ফ্যাক্টরি পরিচালনা করতে চান। কারণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কারখানা চালু রাখার জন্যই। কিন্তু কারখানা পরিচালনা করার মতো পরিবেশ যদি না থাকে, তবে তা চালানো সম্ভব নয়। ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে এবং এই বার্তা আগেই শ্রমিকদের দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারপরও এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে বিশৃঙ্খলা ও কারখানা ভাঙচুর করা হয়েছে, কাজ করতে দেওয়া হয়নি। আমাদের উদ্যোক্তারা এটি নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। অধিকাংশ শ্রমিক কাজ করতে চান এবং মালিকরাও কারখানা চালু রাখতে চান। কিন্তু গুটি কয়েক শ্রমিক নামধারী ব্যক্তি বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এরই মধ্যে বিষয়টি চিহ্নিত করেছে।

আমরা আশা করব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর ভূমিকা নেবে এবং যারা আইন হাতে তুলে নিচ্ছেন, তাদের আইনের আওতায় আনবে। এই বিশৃঙ্খলা বন্ধ না হলে মালিকরা আর ফ্যাক্টরি চালাতে চান না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights