পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার করলেই অর্থনৈতিক সংকট কেটে যায়

বিশেষ প্রতিনিধি
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন সংকটে। অর্থমন্ত্রী নিজেও এই সংকটের কথা স্বীকার করছেন। বিগত ১৭ বছরের অপশাসন এবং দুর্নীতির সাথে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি আমাদের এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে হুহু করে। অতীতের ভুল নীতির কারণে সৃষ্টি হয়েছে বিদ‍্যুৎ এবং গ্যাস সংকট।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অক্টোবর ২০২৬-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩.২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০.৯ শতাংশে উঠতে পারে। চলমান বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের যৌথ বার্ষিক সভায় এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।

আইএমএফের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫০-২৬ অর্থবছরে চূড়ান্ত হিসাবে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩.৬ শতাংশ। সেই বছরের গড় মূল্যস্ফীতি হতে পারে ৮.৭ শতাংশ। অর্থাৎ ২০২৬–২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার কমার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, গত সেপ্টেম্বর মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩৪ শতাংশ।

আইএমএফ বলেছে, প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুর্বল হলে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়লে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও আয় বৃদ্ধির গতি ব্যাহত হবে, এমন ঝুঁকি থাকে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষেরা।

এদিকে, সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সম্পর্কে বলেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি কমছে। বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ব্যাংক খাতে বাড়ছে খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি। উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে কমছে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা।

সরকার অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ইউনূস আমলের ভ্রান্ত নীতির কারণে আন্তর্জাতিক দাতাদের কাছ থেকে অর্থ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। আইএমএফ এখনও নতুন ঋণ অনুমোদন করেনি। আগের ঋণের চতুর্থ কিস্তি ছাড় নিয়েও জটিলতা দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের কাছে দশ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তা চেয়েছেন।

ব‍্যাংককে বিশ্বব্যাংকের কর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এই আলোচনা আরও কয়েকমাস চলবে। সরকার ব‍্যায় নির্বাহের জন্য চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ব্যাংক খাত থেকে ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হওয়ায় পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে সরকারের। অন্যদিকে, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটসহ নানা কারণে চাপে রয়েছে বেসরকারি খাত। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, আবার চালু প্রতিষ্ঠানগুলোও উৎপাদন ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আদায়ও চাপে পড়েছে। এজন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া বেড়েছে।

সরকার এভাবে ঋণের জন্য ছোটাছুটি না করেও অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে তুলতে পারে। বাংলাদেশ থেকে বিগত ১৭ বছরে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে তা উদ্ধারে কার্যকর এবং যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারলে এই অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব। এই অর্থ উদ্ধার হলে বাংলাদেশকে আর কারও কাছে হাত পাততে হয় না।

অর্থনীতির ওপর প্রকাশিত শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন উপায়ে বিদেশে পাচার হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে। টিআইবির হিসাব অনুযায়ী, ইউনূস সরকারের দেড় বছরের শাসনকালে আরও অন্তত পনেরো বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে।

ইউনূস আমলে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালের হিসাব অনুসারে, ওই দেশের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ (সুইজারল্যান্ডের মুদ্রা)। ২০২৪ সালে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ।
ইউনূস সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার ব্যাপারে অনেক ঢাকঢোল পেটালেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বরং এই সময় অর্থ পাচার নিয়ে আগাম মন্তব্য পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারে জটিলতা তৈরি করে। কোনো ধরনের তদন্তে আগেই কাউকে অর্থ পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত করে প্রকৃত পাচারকারীদের আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছিল। পাচারের অর্থ উদ্ধারের নামে বিদেশ ভ্রমণ করা হয়েছে।

বর্তমান সরকার এসে অর্থপাচার ইস্যুতে একটি পরিকল্পিত রোডম্যাপ তৈরি করেছে। পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। পাচারকৃত অর্থ দ্রুত দেশে ফেরত আনার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে এর কার্যক্রমকে ‘ফাস্ট ট্র্যাক’-এ নিয়ে আসার নির্দেশনা দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। ব্যাংক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে সৃষ্ট খেলাপি ঋণের যে অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে, তা ফিরিয়ে আনার জন্য সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করার জন্য ৯টি আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) স্বাক্ষর করা হচ্ছে।

সংস্থাগুলো ‘নো উইন নো ফি’ ভিত্তিতে বাংলাদেশকে পাচারের অর্থ ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সহায়তা করবে। অর্থাৎ এ সংস্থার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে কোনো বাড়তি ফি দিতে হবে না। তারা যে পরিমাণ অর্থ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সহায়তা করবে তার একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ তারা কমিশন হিসাবে লাভ করবে। অর্থ ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হলে সংস্থাগুলো বাংলাদেশ সরকারের কাছে কোনো আর্থিক সুবিধা দাবি করতে পারবে না। কিন্তু, বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে যাওয়া শত শত কোটি ডলার ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় নেমে তদন্তকারীরা এক জটিল আন্তর্জাতিক গোলকধাঁধাঁর মুখোমুখি হচ্ছেন। অবৈধ সম্পদের চূড়ান্ত গন্তব্য সম্পূর্ণ গোপন করতে অর্থ পাচারকারীরা অত্যন্ত জটিল এবং ‘বহু-স্তরের’ (মাল্টি-লেয়ার্ড) কৌশল ব্যবহার করছে, যা ভেদ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যদিও কর কর্তৃপক্ষ ও তদন্তকারী সংস্থাগুলো পাচার হওয়া অর্থের প্রাথমিক বহির্গমন পথ বা প্রথমে যে দেশে গেছে সেটি আংশিকভাবে শনাক্ত করতে পেরেছে, কিন্তু সেই অর্থ প্রায়শই তৃতীয় বা চতুর্থ দেশের পৌঁছানোর পর তদন্তের খেই হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে পাচারকৃত সম্পদ ঠিক কোন দেশে জমা আছে, তা নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করতে স্থানীয় কর্মকর্তাদের বেগ পেতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স বর্তমানে এই প্রচেষ্টাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের কাজ করছে। এই টাস্কফোর্সে বিএফআইইউ, দুদক, সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় রয়েছে। বিএফআইইউ অবৈধ আর্থিক প্রবাহের উৎস সন্ধান করে তা প্রমাণসহ টাস্কফোর্সের কাছে উপস্থাপনের মূল দায়িত্বে রয়েছে।

সরকার পাচার হওয়া সম্পদের সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে ১০টি দেশকে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত পারস্পরিক আইনি সহায়তা ব্যবস্থার আওতায় নীতিগতভাবে সহযোগিতা করতে সম্মত হয়েছে; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ড আন্তর্জাতিক আইন আইন অনুযায়ী সহযোগিতা করার আগ্রহ দেখিয়েছে।

বর্তমান সরকারের অন্যতম নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি হলো, পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা। এই উদ্যোগকে আরও জোরদার করতে হবে। বাংলাদেশ যদি পাচার হওয়া অর্থের অর্ধেকও উদ্ধার করতে পারে তাহলে আমাদের কারও কাছে হাত পাততে হবে না। বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। তাই অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা। এর ফলে একদিকে যেমন বাংলাদেশের অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াবে তেমনি ভবিষ্যতে কেউ অর্থ পাচারের সাহস পাবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights