পা হারিয়েও থেমে যাননি বাবুল, এক পায়েই চালাচ্ছেন সংসারের চাকা
অনলাইন ডেস্ক
এক পা নেই। শারীরিক উচ্চতাও চার ফুটের একটু বেশি। জীবনের নানা প্রতিকূলতা যেন বারবার থামিয়ে দিতে চেয়েছে তাকে। কিন্তু হার মানেননি মানিকগঞ্জের বাবুল হোসেন (৫০)। এক পায়ে ভর করেই ফুটপাতে কলা বিক্রি করে চালিয়ে যাচ্ছেন সংসার। ভিক্ষা নয়, কাজ করে বেঁচে থাকাই তার একমাত্র প্রত্যয়।
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার ছোট ভাটবাউর গ্রামের বাসিন্দা বাবুল হোসেন প্রতিদিন রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের ফুটপাতে কলার পসরা সাজিয়ে বসেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর চলার পথ কঠিন করে তুললেও কাজের প্রতি তাঁর আগ্রহ ও বেঁচে থাকার লড়াই থামেনি।
বাবুল হোসেন জানান, ছোটবেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। এরপর বাবার সঙ্গে কলার ব্যবসায় যুক্ত হন। ১৯৯৭ সালে হঠাৎ তার ডান পায়ে অসুখ দেখা দেয়। অর্থের অভাবে উন্নত চিকিৎসা করাতে পারেননি। একপর্যায়ে অসুস্থ পা কেটে ফেলতে হয়।
পা হারানোর পর কিছুদিন বাড়িতেই বসে ছিলেন বাবুল। পরে আবার বাবার সঙ্গে এক পায়ে ভর করে কলা বিক্রি শুরু করেন। সেই থেকে আজও একই কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি।
বাবুল বলেন, ‘এক পায়ে চলাফেরা করা খুব কঠিন। তারপরও কাজ করে খেতে চাই। ভিক্ষা করতে চাই না। আমার বেশি টাকার প্রয়োজন নেই। বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু দরকার, তাতেই আমি খুশি।’
তাঁর সংসারে স্ত্রী, বাবা, এক ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। বড় মেয়ে দশম শ্রেণিতে এবং ছোট মেয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ছে। মেয়েরা বড় হচ্ছে -এ নিয়ে বাবুলের দুশ্চিন্তাও বাড়ছে। একদিকে সংসারের খরচ, অন্যদিকে দুই মেয়ের ভবিষ্যৎ ও বিয়ের চিন্তা তাঁকে ভাবিয়ে তোলে।
আক্ষেপের সঙ্গে বাবুল বলেন, ‘আমি পঙ্গু মানুষ। ফুটপাতের এক পাশে বসে কলা বিক্রি করি। মাঝে মাঝে পুলিশ এসে উঠিয়ে দেয়। তখন খুব বিপদে পড়ে যাই। কেননা, কলা নিয়ে কোথায় যাব? দু-এক দিনের মধ্যেই কলা পচে যায়।’
তিনি জানান, একবার এক পুলিশ তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, তিনি ভিক্ষা করতে পারেন না, তাহলে রাস্তায় কলা বিক্রি করেন কেন। জবাবে বাবুল বলেছিলেন, ‘আমি না খেয়ে মরে যাব, তবুও ভিক্ষা করব না।’
বাবুলের পাশেই ফুটপাতে কলা বিক্রি করেন রুবেল হোসেন। তিনি বলেন, ‘বাবুলের ব্যবহার খুব ভালো। তার লেনদেনও ভালো। সবসময় বাবুলের কলাই আগে শেষ হয়। মানুষ তার দোকানে বেশি যায়।’
পাশের পান ব্যবসায়ী আলম মিয়াও বাবুলের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘বাবুলের মুখে সবসময় হাসি থাকে। সবার সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলে মাল বিক্রি করে। কারও সঙ্গে কোনো ঝামেলা নেই। সরকার যদি তাঁর জন্য কিছু করত, তাহলে আমরা খুব খুশি হতাম।’
সুদবিহীন এক লাখ টাকা ঋণ পেলে ব্যবসাটা একটু বড় করার স্বপ্ন অভাব আর শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করা বাবুলের। এতে এক পায়ে ভর দিয়ে প্রতিদিনের কষ্ট কিছুটা কমবে। পাশাপাশি একটি কৃত্রিম পা হলে চলাফেরাও সহজ হতো বলে জানান তিনি।
