প্রবাসীদের বাড়িতে মাতম কাটছে না
নিজস্ব প্রতিবেদক
নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গ্রামে গ্রামে চলছে মাতম, নেই সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা। একসময় যাঁদের ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনতেন পরিবারের সদস্যরা; এখন তাঁদের মৃত্যুর খবরে স্তব্ধ স্বজনরা। একসঙ্গে এতগুলো প্রাণ ঝরে যাওয়ায় কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো উপজেলা। বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এবং নিহতদের স্বজনরা ছুটে এসে পরিবারের লোকজনকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। সেখানে বারবার নিহতদের বাবা, মা ও স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার শ্যামল উদ্দিন মাঝির (৪৬) স্ত্রী রশিদা খাতুনের বাড়িতে চলছে মাতম। তিনি দীর্ঘ আট বছর সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন।
নওগাঁ থেকে বাবুল আখতার রানা জানান, সৌদিতে আগুনে মৃত্যুবরণ করা হাসিবুল পরিবারের বড় ছেলে। বিএ পাস করে স্থানীয় একটি এনজিওতে চাকরি করতেন। চাকরিটি চলে যাওয়ার পর কিছুদিন বেকার ছিলেন। পরে জীবিকার সন্ধানে এবং পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা আনতে তিন বছর আগে সৌদি আরবে যান। একই গ্রামের কলিম উদ্দিন প্রামাণিকও নিহত হয়েছেন ওই অগ্নিকাণ্ডে। প্রায় আট বছর আগে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন তিনি। ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা কারিমা বেগম। ছেলের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের কথা মনে পড়লেই তাঁর বুক ফেটে যাচ্ছে। এখন তাঁর একটাই ইচ্ছা-ছেলের লাশ দেশে এনে একবার নিজের চোখে দেখা এবং পরিবারের নিজস্ব কবরস্থানে দাফন করা। নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ এলাকার মৃত মজনুর ছেলে শাহিন। তাঁর স্ত্রী মিম বানুর কোলে ছোট্ট শিশু। মুখে নেই কোনো হাসি। মিম বানু বলেন, ‘প্রায় পাঁচ মাস আগে জীবিকার তাগিদে আমার স্বামী সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন। সেদিন রাতে আমার সঙ্গে কথা বলার মাঝে ফোনটা রাখতে বলে কল কেটে দিয়েছেন। তারপর আর কোনো কথা নেই। আর কখনো কথা হবেও না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার শাশুড়ি ও দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে এখন কেমন করে চলব?’
নিহত ১৬ জন পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তাঁদের কেউ দীর্ঘদিন সেখানে কাজ করছিলেন। আয় করা অর্থ দিয়ে কেউ সংসারের খরচ চালিয়েছেন, কেউ ঋণ শোধ করেছেন, আবার কেউ দেশে ফিরে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করছিলেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ কেউ সৌদি আরবে বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই অবস্থান করছিলেন। ফলে লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আইনি জটিলতা যাতে তৈরি না হয় সেজন্য প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বজনরা।
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত এবং লাশ দেশে আনার বিষয়ে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং কাজ করছে। যথাযথ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে লাশ দ্রুত দেশে আনার ব্যাপারে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দেশে লাশ আসতে কিছুদিন লাগতে পারে। সৌদি দূতাবাস ও নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।’
লাশের অপেক্ষায় শ্যামলের স্বজনরা : রাজশাহী প্রতিনিধি কাজী শাহেদ জানান, মানুষের কোনো সান্ত¦নাই যেন কান্না থামাতে পারছে না রাজশাহীর বাগমারার শ্যামল উদ্দিন মাঝির (৪৬) স্ত্রী রশিদা খাতুনের। রবিবার রাতে সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে বাগমারার শ্যামল উদ্দিন একজন। তাঁর বাড়ি উপজেলার ঝিকড়া ইউনিয়নের মরুগ্রাম ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে। তিনি দীর্ঘ আট বছর সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন। শ্যামলের শাশুড়ি মোমেনা বেগম জানান, সুদের ওপর ঋণ করে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন শ্যামল। কোনোরকম টাকা শোধ করে থাকার মতো একটা বাড়ি করেছেন। তিনি সরকারের কাছে দাবি করেন, লাশ যেন ফেরত আনা হয়। গ্রামে মাটি দিতে চান। শ্যামল ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর তিন মেয়ে। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছোট দুই মেয়ে পড়াশোনা করছে।
মোবাইল ফোনে বিয়ে করা সাব্বির দেখতে পেলেন না স্ত্রীর মুখও
নাটোর থেকে নাসিম উদ্দীন নাসিম জানান, নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরা ইউনিয়নের শ্রীপুর গ্রামের অসহায় দরিদ্র কৃষক মো. রাব্বানীর ছেলে সাব্বির হোসেন। সৌদি আরবের রিয়াদে সোফা কারখানায় আগুনে পুড়ে অন্যদের সঙ্গে সাব্বির হোসেনও মারা যান। সাব্বিরের চাচা আয়চান আলী জানান, সৌদি যাওয়ার দুই বছর পর অর্থাৎ এখন থেকে দুই বছর আগে পাশের নওগাঁর আত্রাই উপজেলার খাসখামার গ্রামের আবদুল জলিলের মেয়ে জলি খাতুনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে সাব্বিরের বিয়ে হয়। দুই বছর পার হয়ে গেলেও শুধু অভাবের কারণে বউ তুলে আনা হয়নি। কথা ছিল কিছুদিন পর সাব্বির দেশে এসে ধুমধাম করে আগে নিজের ছোট বোনকে বিয়ে দেবেন। এরপর নিজের বউ বাড়িতে আনবেন। কিন্তু সাব্বির দেশে আসছেন, তবে জীবিত নন লাশ হয়ে। ধুমধাম করে বিয়ের অনুষ্ঠান আর হবে না, হবে তাঁর দাফনকাফন।
