বিলুপ্তির দ্বার থেকে প্রকৃতিতে ফেরার অপেক্ষায় এক হাজার ব্যাঙ
অনলাইন ডেস্ক
একসময় দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার পাহাড়ি ঝরনা ও জলধারায় অসংখ্য মাউন্টেন ইয়েলো-লেগড ফ্রগের দেখা মিলত। ছোট আকারের এই ব্যাঙটি ছিল ওই অঞ্চলের সবচেয়ে পরিচিত মেরুদণ্ডী প্রাণীদের একটি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে দৃশ্যপট। মানুষের আনা বিদেশি মাছ, ছত্রাকের সংক্রমণ, দাবানল ও আবাসস্থল ধ্বংসে দ্রুত কমতে থাকে এদের সংখ্যা। ২০২১ সালে বনে এই ব্যাঙের সংখ্যা নেমে আসে ২০০ এরও নিচে।
মৃত্যুর সেই কিনারা থেকে প্রজাতিটিকে ফিরিয়ে আনতে এখন কাজ করছেন একদল প্রাণী সংরক্ষণবিদ। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লং বিচে অ্যাকুয়ারিয়াম অব দ্য প্যাসিফিকের একটি বিশেষ ‘ফ্রগ নার্সারি’তে এই প্রজাতির শত শত ব্যাঙাচি ও ছোট ব্যাঙকে বড় করা হচ্ছে। তাদের লক্ষ্য একটাই- প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়া। সম্প্রতি অ্যাকুয়ারিয়ামটি একটি বড় মাইলফলক উদযাপন করেছে। ২০২০ সাল থেকে তারা ১ হাজারের বেশি মাউন্টেন ইয়েলো-লেগড ফ্রগ বনে ফিরিয়ে দিয়েছে। শুধু গত আগস্টেই ৬৫০টির বেশি ব্যাঙ ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪০০টি ব্যাঙ অ্যাকুয়ারিয়ামটির নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বড় করা হয়েছিল।
তবে এই ছোট প্রাণীগুলোকে বনে ফেরানো মোটেই সহজ কাজ নয়। ব্যাঙাচি থেকে পূর্ণাঙ্গ ব্যাঙ হয়ে ওঠার পুরো প্রক্রিয়াটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। কখনো পা গজাচ্ছে, কখনো লেজ ছোট হয়ে আসছে, আবার পানির নিচের জীবন ছেড়ে স্থলভাগের জন্য ফুসফুস তৈরি হচ্ছে- প্রতিটি ধাপেই রয়েছে ঝুঁকি।
অ্যাকুয়ারিয়ামের কর্মীরা দিনে চার থেকে পাঁচবার ব্যাঙাচিদের খাবার দেন। তাদের খাবারে থাকে স্পিরুলিনা, মাছের খাবার ও ক্যালসিয়াম। পরে ব্যাঙগুলোকে এমন পরিবেশে রাখা হয়, যেখানে পানির প্রবাহ পরিবর্তন করা হয়, যাতে প্রকৃতিতে ফিরে যাওয়ার আগে তাদের শরীর ও সাঁতারের সক্ষমতা তৈরি হয়। বন্য পরিবেশের সঙ্গে অভ্যস্ত করতে তাদের খাদ্যতালিকায় জীবন্ত পোকামাকড়ও যোগ করা হয়।
এই উদ্যোগের সাফল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- মানুষের যত্নে বড় হলেও ব্যাঙগুলো প্রকৃতিতে ফিরে গিয়ে নিজেদের স্বাভাবিক আচরণ অনেকটাই ফিরে পায়। একটি ব্যাঙকে ছেড়ে দেওয়ার সময় গবেষকেরা দেখেছেন, একটি সদ্য মুক্ত হওয়া ব্যাঙ পাথরের ওপর লাফিয়ে উঠে সঙ্গে সঙ্গে একটি মাছি খেয়ে ফেলেছে। যে প্রাণীটি আগে কখনো ওই পোকা দেখেনি, তার মধ্যেও শিকার ধরার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি কাজ করেছে।
সংরক্ষণবিদদের জন্য এটি আশাব্যঞ্জক। কিন্তু মাউন্টেন ইয়েলো-লেগড ফ্রগের সংকট শুধু একটি প্রজাতির গল্প নয়। এই ব্যাঙগুলো জলজ বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্যাঙাচি অবস্থায় তারা বিপুল পরিমাণ শৈবাল ও পচনশীল জৈব পদার্থ খেয়ে জলধারাকে পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। পূর্ণাঙ্গ ব্যাঙ আবার অন্য অনেক প্রাণীর খাদ্য। অর্থাৎ একটি ছোট ব্যাঙের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি বৃহত্তর খাদ্যশৃঙ্খল।
এই প্রজাতির সংকটের পেছনে মানুষের কর্মকাণ্ডের ভূমিকা দীর্ঘদিনের। উনিশ শতকের শেষ দিকে বিনোদনমূলক মাছ ধরার জন্য ওই অঞ্চলের জলাশয়ে স্থানীয় নয় এমন ট্রাউট মাছ ছাড়া শুরু হয়। এসব মাছ ব্যাঙাচি খেয়ে ফেলত। পরে ছড়িয়ে পড়ে কাইট্রিড ছত্রাক, যা বিশ্বজুড়ে শত শত উভচর প্রজাতির পতন বা বিলুপ্তির সঙ্গে যুক্ত। এরপর ২০২০ সালের ববক্যাট ফায়ার পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। আগুনে মাউন্টেন ইয়েলো-লেগড ফ্রগের অবশিষ্ট আবাসস্থলের প্রায় ৯৫ শতাংশ ধ্বংস হয়ে যায়। তবে বিপর্যয়ের মধ্যেও সংরক্ষণকর্মীরা কয়েকটি ব্যাঙাচিকে উদ্ধার করতে সক্ষম হন। সেগুলোই পরে বন্দি প্রজনন ও পুনর্বাসন কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
এখন অ্যাকুয়ারিয়াম, চিড়িয়াখানা ও যুক্তরাষ্ট্রের ফিশ অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ সার্ভিস একসঙ্গে কাজ করছে। লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান দিয়েগো চিড়িয়াখানা থেকেও ব্যাঙাচি ও প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাণী আনা হচ্ছে। সম্প্রতি সান দিয়েগো চিড়িয়াখানা থেকে প্রায় ৫০০ ব্যাঙাচির একটি দল এসেছে। জেনেটিক বৈশিষ্ট্যের সামান্য পার্থক্যের কারণে তাদের আলাদা দলে রাখা হয়েছে, যাতে প্রজাতিটির জিনগত বৈচিত্র্যও ধরে রাখা যায়।
বিজ্ঞানীরা জানেন, শুধু প্রাণীকে বড় করে বনে ছেড়ে দিলেই সংরক্ষণ সফল হবে না। তাদের হারানো আবাসস্থলও ফিরিয়ে আনতে হবে, আগ্রাসী প্রজাতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং ছত্রাকের মতো রোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
তারপরও এক হাজার ব্যাঙের ফিরে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা দেয়- বিলুপ্তির কিনারায় পৌঁছে যাওয়া কোনো প্রাণীর গল্প সবসময় শেষ হয়ে যায় না। কখনো কখনো কয়েকটি বেঁচে যাওয়া ব্যাঙাচি, একটি নিরাপদ নার্সারি এবং কিছু মানুষের দীর্ঘদিনের চেষ্টা একটি প্রজাতির জন্য আবারও ভবিষ্যতের দরজা খুলে দিতে পারে। আর সেই ভবিষ্যৎ শুধু ব্যাঙটির জন্য নয়- তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পুরো পাহাড়ি জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্যও।
তথ্য সূত্র : এপি নিউজ।
