ভারতে এসআইআর বিতর্কে কাঠগড়ায় নির্বাচন কমিশন, প্রশ্নের মুখে সংবাদমাধ্যমও

অনলাইন ডেস্ক
ভারতে নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ নিবিড় পর্যালোচনা (এসআইআর) ঘিরে তুমুল আন্দোলন চলছে। এসআইআর বিতর্কে ভারতের নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সংখ্যাগত তথ্য যাচাইয়ে সাংবাদিকদের দুর্বলতা এবং চটকদার শিরোনামের প্রতিযোগিতা জনমনে বিভ্রান্তিকর ধারণা তৈরি করছে বলে মনে করছেন মার্কিন অর্থনীতিবিদ ও গবেষক রবি জগন্নাথন।

তার মতে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ত্রুটি থাকলেও, তথ্য বিশ্লেষণ না করে বড় সংখ্যাকে বারবার প্রচার করা সত্য অনুসন্ধানের জন্য আরও বড় সংকট।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই মার্কিন নাগরিক জানান, গণতন্ত্রে স্বৈরশাসনের তুলনায় তথ্য পাওয়ার সুযোগ বেশি থাকলেও তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নির্ভর করে তার উৎস ও যাচাইয়ের ওপর। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে কেউ নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে তুলে ধরতে পারেন। এর সঙ্গে টেলিভিশন উপস্থাপক ও সংবাদপত্রের ক্লিকবেইট শিরোনামের প্রতিযোগিতা যুক্ত হওয়ায় সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রকৃত তথ্যের কাছাকাছি পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যালগরিদমও ব্যবহারকারীদের একই ধরনের মতামতের মধ্যে আটকে রাখে। ফলে বাস্তব তথ্যের বদলে আবেগ ও উচ্চকণ্ঠ প্রচারণা জনমতকে বেশি প্রভাবিত করতে পারে।

রবি জগন্নাথনের মতে, সাংবাদিকতার শিক্ষানবিশদের প্রায়ই কোনো ঘটনার ‘অ্যাঙ্গেল’ বা বিশেষ দৃষ্টিকোণ খুঁজতে বলা হয়। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ পুরো বাস্তবতার সীমিত অংশ তুলে ধরে।

কিন্তু বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমনির্ভর পরিবেশে সত্য অনুসন্ধানের চেয়ে বর্ণনা তৈরি ও দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এর উদাহরণ হিসেবে ২০১৪-১৫ সালে ভারতের গির্জায় কয়েকটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর খ্রিষ্টানদের ওপর ধারাবাহিক হামলার যে বয়ান তৈরি হয়েছিল, তার কথা উল্লেখ করেছেন জগন্নাথন। তার দাবি, পরে মন্দির ও গুরুদ্বারেও একই ধরনের ঘটনা নিয়মিত ঘটার তথ্য সামনে এলে সেই বয়ান দুর্বল হয়ে পড়ে। পশ্চিমবঙ্গে এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসিনীকে ধর্ষণের ঘটনাটি নিয়েও সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন ও পরবর্তী তথ্যের মধ্যে অসংগতি ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সংখ্যা যাচাইয়ের দুর্বলতা কীভাবে জনমতকে প্রভাবিত করে, তা বোঝাতে লেখক ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়ার আলোচিত সংখ্যাটির উদাহরণ দিয়েছেন।

তার মতে, সংখ্যাটি বারবার প্রচারিত হওয়ায় অনেকেই এর অর্থ ও প্রেক্ষাপট যাচাই না করেই একে ব্যাপক ভোটাধিকার হরণের প্রমাণ হিসেবে দেখছেন। মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের প্রভাবকে ‘অ্যাঙ্করিং ইফেক্ট’ বলা হয়। কোনো বিষয়ে প্রথমে একটি বড় সংখ্যা সামনে এলে পরবর্তী আলোচনা ও বিচার-বিশ্লেষণ সেই সংখ্যাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে পারে। একইভাবে, সম্ভাব্য ক্ষতির আশঙ্কা মানুষের সিদ্ধান্তকে সম্ভাব্য লাভের চেয়ে বেশি প্রভাবিত করে। ফলে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার আশঙ্কায় থাকা ব্যক্তিরা নিজেদের উদ্বেগ বেশি জোরালোভাবে প্রকাশ করেন; যাদের নাম বাদ পড়েনি, তাদের অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে কম আলোচনায় আসে।
এছাড়াও অতীতের কয়েকটি ঘটনাও তুলে ধরেছেন জগন্নাথন। ২০০৮ সালে টেলিযোগাযোগ লাইসেন্স বরাদ্দে নিলাম না হওয়ায় ভারতের তৎকালীন মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক বিনোদ রাই সরকারি কোষাগারের সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ ১ লাখ ৭৬ হাজার কোটি রুপি বলে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি আরও কয়েকটি কম হিসাব দিলেও সবচেয়ে বড় সংখ্যাটিই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে। তার মতে, সম্ভাব্য ক্ষতির হিসাবকে প্রকৃত ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা পরবর্তী নীতিনির্ধারণেও প্রভাব ফেলেছিল।

কৃষক আত্মহত্যার পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রেও লেখক একই ধরনের প্রবণতা দেখেছেন। তার উল্লেখ করা এক গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৯৫ সাল থেকে পরবর্তী কয়েক দশকে ভারতে প্রায় ৩ লাখ ৯০ হাজার কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। বছরে এখনো প্রায় ১০ হাজার কৃষক আত্মহত্যা করেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল বিপুল জনগোষ্ঠীর তুলনায় এ সংখ্যাকে কীভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে, সে প্রশ্নও তুলেছেন জগন্নাথন। তার মতে, মানবিক বিপর্যয়ের গুরুত্ব স্বীকার করেও পরিসংখ্যানের যথাযথ প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি।

ভারতে পুরুষদের আত্মহত্যার হার নারীদের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ—এমন তথ্যের কথাও উল্লেখ করেছেন স্বরাজ্য পত্রিকার সাবেক এই সম্পাদকীয় পরিচালক। তার মতে, পুরুষদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনা হওয়াও দেখায়, মানুষ অনেক সময় বাস্তবতার সব দিক বিবেচনা না করে আগে থেকে গড়ে ওঠা ধারণার সঙ্গে মেলে এমন তথ্যকেই গুরুত্ব দেয়।

এসআইআর বিতর্কে জগন্নাথনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার হিসাবের মধ্যে ২ কোটি ৮০ লাখকে মৃত, ৬ কোটি ৩০ লাখকে সম্ভাব্য স্থায়ী অভিবাসী এবং এক কোটিকে একাধিক জায়গায় নিবন্ধিত ভোটার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রায় তিন কোটি মানুষ জরিপের সময় নিজ নিজ ঠিকানায় উপস্থিত ছিলেন না।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই লেখকের দাবি, মৃত্যু ও অভিবাসনের জাতীয় প্রবণতার সঙ্গে এসব সংখ্যা পুরোপুরি অসংগত নয়। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, এর অর্থ এই নয় যে ভোটার তালিকা থেকে অন্যায়ভাবে কারও নাম বাদ পড়েনি।

তার ধারণা, সারা দেশে অন্যায়ভাবে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা ৫০ লাখের কম হতে পারে। বাদ পড়া ভোটারদের জন্য আপিলের মাধ্যমে নাম পুনর্বহালের সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। তার মতে, প্রকৃত সমস্যা হলো—বিপুল জনসংখ্যার দেশে ভোটার তালিকা হালনাগাদের প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য ভুল শনাক্ত ও সংশোধনের জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী ব্যবস্থা রাখা হয়নি।

সর্বশেষ নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ব্যাপক ভোটাধিকার হরণের ষড়যন্ত্রের অভিযোগের চেয়ে প্রক্রিয়াগত দুর্বলতা ও ভুল সংশোধনের সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা বেশি জরুরি। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের পরিসংখ্যান বোঝা, সংখ্যার প্রেক্ষাপট যাচাই করা এবং তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরির দক্ষতা বাড়াতে হবে বলে জানান তিনি। তার মতে, তথ্য যাচাইয়ে সংবাদমাধ্যমের ব্যর্থতা সত্য অনুসন্ধানের জন্য গুরুতর সংকট তৈরি করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights