মুক্ত সংস্কৃতি ও চিন্তার পথের কালো থাবা রুখে দেওয়ার প্রত্যয়

অনলাইন ডেস্ক

বৈশাখ মানে সব ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে মুক্ত সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক চিন্তার সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ। বারবারই এর চর্চা আর প্রকাশকে অবরুদ্ধ করে রাখার অপচেষ্টা হয়েছে। সাম্প্রদায়িকতার সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে, অপসংস্কৃতি, ধর্মান্ধতার মোড়কে একে জিম্মি করে সমাজকে পিছিয়ে দেওয়ার অপতৎপরতাও চলেছে সমান তালে। তবে সব জীর্ণতা ঝেরে ফেলে এবারের বৈশাখ বাঙালিকে জাগিয়ে দিয়েছে স্বরূপে, মুক্ত প্রাণের উচ্ছ্বাসে।

শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়ে কীভাবে কাটল এবারের বৈশাখ—এ নিয়ে গতকাল কালের কণ্ঠে আয়োজিত হলো বৈশাখী আড্ডা। কালের কণ্ঠ কার্যালয়ে হাজির হয়ে এ আড্ডায় অংশ নেন দেশের স্বনামধন্য সাহসী সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, অধ্যাপক, আইনজীবী ও বিভিন্ন পেশার বিশিষ্টজনরা। যাঁরা অকপটে এবার মুক্ত বিহঙ্গের মতো মন খুলে বৈশাখ উদযাপনের আনন্দের ওই কথাগুলোই বলেন। আর আড্ডাটির প্রাণবন্ত আলোচনা এক পর্যায়ে রূপ নেয় অনানুষ্ঠানিক জাতীয় সংলাপে।

কালের কণ্ঠের সম্পাদক কবি হাসান হাফিজের সূচনা বক্তব্য, নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলীর শুভেচ্ছা বক্তব্য ও বার্তাপ্রধান ফারুক মেহেদীর সঞ্চালনায় আয়োজনটি পূর্ণতা পায় বিশিষ্টজনদের মন খুলে কথা বলার মধ্য দিয়ে। আলোচনাটি শুধু উৎসবের স্মৃতিচারণাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা, সাংস্কৃতিক সংকট, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, মব সন্ত্রাস, উগ্রবাদ, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে খোলামেলা মতামত ব্যক্ত করা হয়।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই বক্তারা বলেন, পহেলা বৈশাখ কেবল একটি উৎসব নয়, এটি বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক, ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে মানুষের মিলনমেলা এবং একটি সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধ।

বৈশাখ উদযাপনের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া বলেন, ‘বেনজীর ইস্যু হোক কিংবা রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার, কালের কণ্ঠ বারবার সাহসী ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে। ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধেও তথ্যভিত্তিক সংবাদ প্রকাশ করেছে।’

সাংবাদিক ও কলামিস্ট মাহবুব কামাল তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন শাসনামল ছিল বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর একটি সুপরিকল্পিত আক্রমণ।’ তিনি অভিযোগ করেন, “মুক্তিযুদ্ধ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ‘রিসেট’ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। মব কালচার, ভাঙচুর, উগ্রবাদ—সবকিছু ছিল একটি জাতিকে দুর্বল করার কৌশল।” তাঁর মতে, ধর্ম ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়, কিন্তু সংস্কৃতি একটি জাতির পরিচয়।

এই সংস্কৃতিকে ইসলামিকীকরণের নামে বদলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
সাংবাদিক এম এ আজিজ বলেন, আগে গ্রামবাংলায় বৈশাখ মানেই ছিল মেলা, যাত্রা, পালাগান, খেলাধুলা; এখন সেসব কমে গেলেও নগরজীবনে নতুনভাবে উৎসব ফিরে এসেছে। তিনি বলেন, ‘কালের কণ্ঠ বর্তমানে অনেক বেশি আলোচিত ও প্রভাবশালী। সাহসী অনুসন্ধানী রিপোর্টের মাধ্যমে তারা পাঠকের আস্থার জায়গা তৈরি করেছে।’ একই সঙ্গে তিনি বর্তমান সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, ‘সাংবাদিকদের স্বাধীনতা আগের মতো নেই। রাজনৈতিক ও করপোরেট প্রভাবমুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন।’

সিনিয়র সাংবাদিক মোস্তফা ফিরোজ বলেন, ‘ইউনূসের মতো এ রকম বিশ্বাসভঙ্গকারী শাসক আমি জীবনে দেখিনি। তিনি একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তির সম্ভাবনাকে ধ্বংস করেছেন।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক গোলাম মওলা রনি বলেন, ‘ড. ইউনূসের সময় বৈশাখের আনন্দের সঙ্গে মব জাস্টিস, সাম্প্রদায়িকতা আর ভয়ের সংস্কৃতি যোগ হয়েছিল।’

সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না বলেন, ‘ড. ইউনূসের সময়কার ১৮টি মাস ছিল এক শ্বাসরুদ্ধকর অধ্যায়। আমি এবং আমার পরিবার ব্যক্তিগতভাবে ভয় ও চাপে ছিলাম।’

গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আবদুর নূর তুষার তীব্র ভাষায় সমালোচনা করে বলেন, ‘ড. ইউনূস প্রমাণ করেছেন, একজন অসভ্য লোকও নোবেল শান্তি পুরস্কার পেতে পারেন।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘মব জাস্টিসের প্রধান উসকানিদাতা ছিলেন স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টা। তাঁর ছত্রচ্ছায়ায় দেশে সহিংসতা হয়েছে।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বলেন, ‘বর্তমানে গালিগালাজ করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। নতুন প্রজন্মকে এটি ভয়ংকর ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে যে ব্যালেন্সিং রাজনীতি চলছে, তা বিপজ্জনক।’

সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহিদ খান বলেন, ‘বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা প্রকাশ্য রাজনীতি নয়, গুপ্ত রাজনীতি।’ তিনি ড. ইউনূসকে আখ্যা দেন ‘হাফ নোবেল লরিয়েট’ হিসেবে এবং বলেন, ‘গত ১৮ মাস শাসন করেছে একদল ছদ্মবেশী শক্তি।’

সিনিয়র আইনজীবী মোহসিন রশীদ বলেন, ‘আমি প্রথম দিন থেকেই ড. ইউনূসকে বাটপার বলে আসছি। তাঁর সরকার ছিল বখাটেদের সরকার।’ তিনি বর্তমান সরকার প্রসঙ্গে বলেন, ‘এই সরকারের ভিশন এখনো স্পষ্ট নয়।’

সাংবাদিক মাহবুব আজিজ বলেন, ‘সব মত, পথ ও ধর্মের মানুষকে বৈশাখী শোভাযাত্রার মতো এক জায়গায় দাঁড়াতে হবে।’

সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ কামাল বলেন, ‘যদি বর্তমান সরকার আগের সরকারের ভুলগুলোই বহন করে, তবে এই সময়কে ভালো বলার সুযোগ কোথায়? বর্তমান শাসনব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে এখনো ড. ইউনূসের সময়ের সম্প্রসারিত রূপ মনে হচ্ছে।’

সাংবাদিক আনিস আলমগীর বলেন, ‘সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা হলো, একেক সময় একেক রাজনৈতিক তকমা দেওয়া হয়। মানুষ আমাকে কখনো আওয়ামী লীগের সাংবাদিক, কখনো অন্য পক্ষের লোক বলে। অথচ আমি কেবল সত্য বলি।’ তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমান সরকার এখনো অনেক ক্ষেত্রে ইউনূসের এক্সটেনশন মনে হচ্ছে।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী বলেন, ‘বৈশাখ শুধু উৎসব নয়, এটি জাতীয় ঐক্যের জায়গা। এটি এমন একটি উপলক্ষ, যেখানে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ এক ছাতার নিচে আসে।’

আলোচনার পুরোটাজুড়েই বক্তারা কালের কণ্ঠের সাহসী সাংবাদিকতা, মুক্তিযুদ্ধপন্থী অবস্থান এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সমর্থন দেওয়ার জন্য ভূয়সী প্রশংসা করেন। বক্তারা বলেন, ক্ষমতার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কালের কণ্ঠ যে ভূমিকা পালন করেছে, তা বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে অনন্য দৃষ্টান্ত।

কালের কণ্ঠের সম্পাদক ও কবি হাসান হাফিজ তাঁর সমাপনী বক্তব্যে বলেন, ‘সামনে হয়তো আরো কঠিন দুঃসময় অপেক্ষা করছে। আমরা আমাদের পেশাদারিতে অনড় ছিলাম। ১৭ এপ্রিল বা ৭ মার্চের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে অস্বীকার করার উপায় নেই; ইতিহাসকে বদলানো যায় না। মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে কালের কণ্ঠ কোনো আপস করবে না। আমরা সম্মিলিতভাবে ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাব।’

কালের কণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলী অতিথিদের বৈশাখী আড্ডায় অংশ নেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘যে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে আপনারা কলম ও কণ্ঠের সাহসিকতা দিয়ে সমাজকে মুক্ত করেছেন, তাতে আপনারা প্রত্যেকেই আমার দৃষ্টিতে একেকজন মুক্তিযোদ্ধা। আপনাদের এই আলোকিত মুখগুলোই আমাদের আগামীর প্রেরণা। কালের কণ্ঠ সব সময় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে দাঁড়িয়েছে এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আমাদের এই যাত্রা অব্যাহত থাকবে।’

অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ও কালের কণ্ঠের বার্তাপ্রধান ফারুক মেহেদী বলেন, ‘এই বৈশাখী আড্ডা কেবল উৎসবের সমাপ্তি নয়, বরং একটি নতুন সংগ্রামের শুরু। আপনাদের প্রতিটি কথা আমাদের পেশাগত জীবনের দিকনির্দেশনা। ক্ষমতার কোনো রক্তচক্ষুই যেন আমাদের সত্য প্রকাশ থেকে বিচ্যুত করতে না পারে, সেই লক্ষ্যেই আমাদের মাল্টিমিডিয়া ও প্রিন্ট সংস্করণ কাজ করে যাচ্ছে। জীর্ণতা ঝেরে ফেলে আমরা একটি প্রগতিশীল আগামী নির্মাণ করতে চাই।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights