মৃত ভেবে শেষকৃত্যও শুরু, ১১ দিন পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে শোনা গেল ‘বাঁচাও’

অনলাইন ডেস্ক
নেপালে ভয়াবহ বন্যায় নিখোঁজ হওয়ার পর মৃত ভেবে পরিবারের সদস্যরা শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতাও শুরু করেছিলেন। কিন্তু স্বজনদের সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করে ১১ দিন পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত উদ্ধার হয়েছেন ৬৪ বছর বয়সী চণ্ডিকা কুমারী শ্রেষ্ঠা।

গত ২৬ আগস্ট বন্যার পানির তোড়ে নেপালের বেত্রাবতী এলাকার বাড়িঘর ও স্থাপনা ভেসে যায়। ওই সময় স্বামীকে নিয়ে নিজেদের বাড়িতে ছিলেন চণ্ডিকা। প্রবল স্রোতে তাঁদের সাড়ে চারতলা বাড়িটি ভেসে গিয়ে ত্রিশূলী নদীর তীরে আটকে যায়।

এরপর টানা আট দিন চণ্ডিকার সন্ধান চালান পরিবারের সদস্যরা। তাঁর জামাতা বেত্রাবতী ও ত্রিশূলী নদীর তীর ধরে দুই থেকে তিন দিন খোঁজ করেন। কিন্তু চারপাশের গভীর কাদা, জলাবদ্ধতা ও ধ্বংসস্তূপের কারণে উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়ে।

একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যরা ধরে নেন, চণ্ডিকা আর বেঁচে নেই। কাঠামো বা মরদেহের কোনো সন্ধান না পাওয়ায় তাঁরা কাঠমান্ডুর সানো ভর্যাংয়ে তাঁর প্রতীকী শেষকৃত্যের আয়োজন করেন। মরদেহের পরিবর্তে কুশ ঘাস দিয়ে একটি প্রতিকৃতি তৈরি করে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শুরু করা হয়।

তবে পরিবারের একজনের মনে তখনও আশা ছিল। চণ্ডিকার সমধি রমেশ মান শ্রেষ্ঠার ধারণা ছিল, বাড়ির ভেতরে কোনোভাবে তিনি বেঁচে থাকতে পারেন।

তিনি বলেন, ‘তিনি যদি বাড়িতেই থেকে থাকেন, তাহলে হয়তো ওপরের দিকে ছিলেন।’

ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ভেসে এল কণ্ঠ

চণ্ডিকার সন্ধান মেলে বন্যার ১১তম দিনে। রাস্তার কাজের জন্য ওই এলাকায় গিয়েছিল সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর একটি দল। তখন ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ক্ষীণ শব্দ শুনতে পান দলের সদস্যরা।

এরপর তাঁরা হাত দিয়ে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ সরাতে শুরু করেন। একপর্যায়ে একটি জানালা দিয়ে বাড়িটির ভেতরে প্রবেশের পথ তৈরি হয়। সেখানেই আধচেতন অবস্থায় চণ্ডিকাকে দেখতে পান উদ্ধারকারীরা।

বন্যার স্রোতে বাড়িটি মূল অবস্থান থেকে প্রায় ১০০ মিটার সরে গিয়েছিল। ভবনের প্রায় সাড়ে তিন তলা কাদা ও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যায়। তবে ওপরের একটি অংশ তুলনামূলকভাবে খোলা থাকায় সেখানে সামান্য বাতাসের জায়গা তৈরি হয়েছিল। সেই সংকীর্ণ স্থানেই ১১ দিন ধরে বেঁচে ছিলেন চণ্ডিকা।

প্রায় ৪৫ মিনিটের অভিযানের পর তাঁকে উদ্ধার করা হয়। পরে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হেলিকপ্টারে নেপাল সেনাবাহিনীর ত্রিশূলীর মৈথিলী ব্যারাকে নেওয়া হয়। সেখান থেকে তাঁকে কাঠমান্ডুর ছাউনির আর্মি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

ফোনে খবর পেল পরিবার

চণ্ডিকাকে জীবিত উদ্ধারের খবর প্রথমে তাঁর মেয়ের মাধ্যমে পরিবারের কাছে পৌঁছায়। খবর পেয়েই হাসপাতালে ছুটে যান রমেশ।

তবে চিকিৎসকদের পরামর্শে প্রথম ৭২ ঘণ্টা পরিবারের সদস্যদের তাঁর সঙ্গে সরাসরি দেখা করতে দেওয়া হয়নি। পরে চণ্ডিকার নাতিও হাসপাতালে যায়।

দাদিকে জীবিত পাওয়ার খবর শোনার পর সে একটানা কাঁদছিল এবং ঠিকমতো খাওয়াদাওয়াও করছিল না বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। আগের দিন সে প্রার্থনা গেয়ে সময় কাটিয়েছিল।

কয়েক দিন আগেও যে পরিবারটি চণ্ডিকার মৃত্যুর আশঙ্কায় শেষকৃত্যের প্রস্তুতি নিয়েছিল, তাঁদের কাছে তাঁর জীবিত উদ্ধারের খবরটি তাই অবিশ্বাস্য হয়ে আসে।

বন্যার পরও চলছে উদ্ধার অভিযান

চণ্ডিকাকে উদ্ধারের ঘটনা নেপালের বন্যাকবলিত এলাকায় সাম্প্রতিক কয়েকটি সফল উদ্ধার অভিযানের একটি।

এর আগে রাসুয়া জেলার আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গ থেকে চীনা নাগরিক লু হাইতাওকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। ওই সুড়ঙ্গের প্রায় ২২৫ মিটার ভেতরে আটকা ছিলেন তিনি। এর আগের দিন আরেকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল।

গত ২৬ আগস্ট ভোতেকোশি নদীর অববাহিকায় আকস্মিক বন্যার পর নেপালের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। পানির প্রবল স্রোতে বাড়িঘর, সড়ক ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়। বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

ধ্বংসস্তূপের নিচে শক্ত হয়ে যাওয়া কাদার স্তর এবং বিভিন্ন ভবনের ভেতরে কেউ আটকে আছেন কি না, তা খুঁজতে এখনো অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে উদ্ধারকারী দল।

চণ্ডিকার ঘটনা সেই অনুসন্ধানে নতুন আশার জন্ম দিয়েছে। মৃত ভেবে শেষকৃত্যের প্রস্তুতি নেওয়ার পরও একজন মানুষ ১১ দিন ধ্বংসস্তূপের নিচে বেঁচে থাকতে পারেন—এই ঘটনা স্বজনদের কাছে যেমন অবিশ্বাস্য, তেমনি উদ্ধারকারীদের জন্যও বড় এক সাফল্য।

সূত্র: টিই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights