মৃত মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণের গুরুত্ব

মীর মো. গোলাম মোস্তফা

মানুষের ইবাদতগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠতম ইবাদত হলো মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা। এটি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। মহান আল্লাহ এটিকে তাঁর তাওহিদ ও ইবাদতের সঙ্গে যুক্ত করেছেন, তাঁদের অধিকারকে নিজের অধিকারের সঙ্গে সংযুক্ত করেছেন এবং তাঁদের কৃতজ্ঞতাকে নিজের কৃতজ্ঞতার সঙ্গে একাধিক স্থানে উল্লেখ করেছেন। যেমন-মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন, ‘আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ করবে।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ২৩)

মা-বাবার জীবদ্দশায় তাঁদের সঙ্গে সদ্ব্যবহারের মধ্যে যত কল্যাণ, সৌন্দর্য, উপকার ও মর্যাদা রয়েছে, মৃত্যুর পরও সেই সদ্ব্যবহার অব্যাহত রাখা আরো পূর্ণাঙ্গ, আরো সুন্দর, আরো উপকারী ও আরো মর্যাদাসম্পন্ন। বরং মৃত্যুর পর তাঁদের এ সদ্ব্যবহারের প্রয়োজন আরো বেশি। প্রশ্ন হলো, মৃত মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহারে কী কী করা যায়। নিম্নে তার কয়েকটি তুলে ধরা হলো-

তাঁদের জন্য দোয়া ও ইস্তিগফার করা : মহানবী (সা.) বলেছেন, যখন মানুষ মৃত্যুবরণ করে তখন তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায় তিন প্রকার আমল ছাড়া।

১. সদকায়ে‌ জারিয়াহ অথবা ২. এমন ইলম (দ্বিনি জ্ঞান) যার দ্বারা উপকার হয় অথবা ৩. পুণ্যবান সন্তান যে তার জন্য দোয়া করতে থাকে। (মুসলিম, হাদিস : ৪১১৫)

তাই সন্তানদের দায়িত্ব তাদের মৃত মা-বাবার জন্য সব সময় দোয়া করা। পবিত্র কোরআনে মা-বাবার জন্য করণীয় কয়েকটা দোয়াও রয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো, সুরা ইবরাহিমের ৪১ নং আয়াত।

যেখানে মা-বাবার জন্য সাবলীল ভাষায় দোয়া করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে আমাদের রব, যেদিন হিসাব কায়েম হবে, সেদিন আপনি আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে ও মুমিনদেরকে ক্ষমা করে দেবেন’। (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৪১)

নুহ (আ.) দোয়া করেছেন, ‘হে আমার রব! তুমি ক্ষমা করো আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে, যারা আমার গৃহে মুমিন হয়ে প্রবেশ করে তাদেরকে আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের; আর জালিমদের জন্য ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করো না।’ (সুরা : নুহ, আয়াত : ২৮)

মা-বাবার ঋণ পরিশোধ বা অসিয়ত বাস্তবায়ন করা : এটাও মৃত-বাবার প্রতি সন্তানের অন্যতম সদাচরণ। কোনো দরিদ্র আত্মীয়, প্রতিবেশী, বন্ধু বা বিশেষ কোনো কাজের ব্যাপারে তাঁদের অঙ্গীকার থাকলে, তা বাস্তবায়ন করাও মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের অন্তর্ভুক্ত, যতক্ষণ তা গুনাহ না হয়।

ঋণ ও মানত পালন করা : বিশেষ ঋণ পরিশোধের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া আবশ্যক। কেননা ঋণ বান্দার হক, যতক্ষণ বান্দা তাদের হকের দাবি ছাড়বে না, আল্লাহ মাফ করবেন না। হাদিস শরিফে এসেছে, ঋণ ছাড়া শহীদের সব গুনাহই ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (মুসলিম, হাদিস : ৪৭৭৭)

মানতের ব্যাপারে ইরশাদ হয়েছে, আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি নিজের ওপর কাজা সওম রেখে মারা যায় তার পক্ষ থেকে তার উত্তরাধিকারীরা তা আদায় করবে। ইমাম আবু দাউদ (রহ.) বলেন, এখানে মানতের রোজার কথা বলা হয়েছে।
(আবু দাউদ, হাদিস : ২৪০০)

তাঁদের নিকটাত্মীয় ও বন্ধুদের কদর করা : মা-বাবা মারা যাওয়ার পর তাঁদের ভাই, বোনসহ নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং তাঁদের বন্ধুবান্ধবকে সম্মান করাও তাঁদের সঙ্গে সদাচরণের পর্যায়ে পড়ে। রাসুল (সা.) বলেছেন, সর্বোত্তম নেকির কাজ হলো, বাবার বন্ধুর সঙ্গে সহমর্মিতার সম্পর্ক বজায় রাখা। (মুসলিম, হাদিস : ৬৪০৭)

তাঁদের পক্ষ থেকে সদকা করা : সদকার সওয়াব যে মৃতের কাছে পৌঁছে, এ বিষয়ে আলেমদের ইজমা রয়েছে। বিশেষত সদকায়ে জারিয়া তথা মসজিদ নির্মাণ, কূপ, হাসপাতাল, কোরআন ও উপকারী বই ছাপানো, এতিম ও দরিদ্রদের সহায়তা—এসব কাজ সবচেয়ে উত্তম।

নিজে নেক আমল করা : সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নিজেকে সংশোধন করা। নিজে নেককার হওয়া। কারণ সন্তান মা-বাবার উপার্জন। সন্তানের নেক আমল মা-বাবাকে পরকালে সম্মানিত করে। মহানবী (সা.) বলেছেন, যে কোরআন পাঠ করে এবং তদানুযায়ী আমল করে, কিয়ামতের দিন তাঁর মা-বাবাকে মুকুট পরানো হবে। (আবু দাউদ, হাদিস : ১৪৫৩)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights