যুদ্ধে যাওয়ার সময় সঙ্গে ছিল মায়ের দেওয়া ৫ টাকা

মোশাররফ হোসেন বেলাল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

অগ্নিঝরা মার্চ। বাঙালির জাতীয় জীবনে স্বাধীন অস্তিত্বের স্বপ্ন বুননের মাস। এই মাসেই বীর বাঙালি দৃঢ়চেতা হয়ে ওঠেন একটি স্বাধীন মানচিত্র, একটি স্বাধীন দেশের জন্য। যেখানে থাকবে না কোনো বৈষম্য, লাঞ্ছনা-বঞ্চনা আর বর্বর পাক বাহিনীর দমন, পীড়ন, নির্যাতন, ধর্ষণসহ ধ্বংসলীলা।

২৫ মার্চে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর চালানো বর্বর গণহত্যার জবাব দিতেই সেদিন থেকে লাখ লাখ বীর সেনানী অস্ত্র হাতে মাঠে নামেন। তাঁদেরই একজন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার উত্তর ইউনিয়নের আমোদাবাদ গ্রামের আবদুল আবু সাইয়িদআজিজের ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবু সাইয়িদ মিয়া। আট বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম। মাত্র ১৭ বছর বয়েসে তিনি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। দীর্ঘ ৯ মাসের লড়াই সংগ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় লাল-সবুজের বাংলাদেশ। তিনি আখাউড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার। মুক্তিযুদ্ধকালীন নানা ইতিহাসের কথা জানতে বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর পক্ষ থেকে কথা হয় এই বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবু সাইয়িদ মিয়ার সঙ্গে।

স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে আবু সাইয়িদ অশ্রুসিক্ত হয়ে বলেন, ‘কোনো টাকা পয়সা আর ধন দৌলতের জন্য নয়, বরং মা মাটি দেশকে হানাদার বাহিনীর কবল থেকে রক্ষা করতে জীবনবাজি রেখে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। এর জন্য মাকে অনেক কষ্টে রাজি করাতে হয়। বলতে গেলে একপ্রকার গোপনেই বাড়ি থেকে বের হয়ে যাই।’ তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে আমি আখাউড়া উপজেলার সৈয়দাবাদ আদর্শ মহাবিদ্যালয়ের এইচএসসি শিক্ষার্থী ছিলাম। তখন বয়স ছিল ১৭ বছর। হানাদার বাহিনী যখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বেশ কয়েকটি জায়গায় হামলা শুরু করে, তখন আমাদের এলাকার অনেকে পাশর্^বর্তী বিজয়নগর উপজেলার সিঙ্গারবিল বাজারে জড়ো হন। সেখান থেকে সীমান্ত দিয়ে ভারতের শরণার্থী শিবিরে যাওয়া শুরু হয়। সে সময় বন্ধু ইলিয়াস ও সামাদকে নিয়ে আমি বাড়ি থেকে বের হয়ে যাই। সঙ্গে ছিল মায়ের দেওয়া ৫ টাকা।’ তিনি বলেন, ‘সিঙ্গারবিলের নোয়াবাদী সীমান্তের ওপারের নরসিংঘর দিয়ে আগরতলা চলে যাই। খবর পাই কংগ্রেস ভবনে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রিক্রুট করানো হচ্ছে। সেখানে গেলে অন্যান্যদের সঙ্গে আমাকে প্রথমে আগরতলার কাতলামারা নামকস্থানে লে. কর্নেল ইব্রাহীমের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে ১১ দিন থাকার পর আসামে পাঠিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তারপর একাধিক সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি।’ তিনি বলেন, ‘৭১ সালের ১৪ আগস্ট। আমি তখন সিলেটের জকিগঞ্জে। খবর আসে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে পাকিস্তানি এক ক্যাপ্টেন অতিথি হয়ে আসছেন। সকাল ৯টায় ওই বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠান হবে। এর আগেই আমরা আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখি। ৮টার দিকে একটি গাড়ি বিদ্যালয়ের দিকে এগোতে থাকে। পূর্ব প্রস্তুতি অনুযায়ী আমরা পাহাড়ের ওপর থেকে আক্রমণ চালাই। আক্রমণে গাড়ির চালকসহ বেশ কয়েকজন মারা যায়। তবে ক্যাপ্টেন সেখান থেকে পালিয়ে প্রাণে বেঁচে যায়।’ বর্তমান সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে কোনো প্রত্যাশা আছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে মুক্তিযোদ্ধা আবু সাইয়িদ মিয়া বলেন, তারেক রহমান সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক বীরউত্তম মেজর জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার সন্তান। দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফেরার পর এবং একটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তাঁর কাছে জনগণের প্রত্যাশা- মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনুযায়ী দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং দীর্ঘস্থায়ী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা। এ ছাড়া প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন করাও জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights