লোহিত সাগর রক্ষায় সৌদি নেতৃত্বে নতুন জোট কতটা সফল হবে?

অনলাইন ডেস্ক
লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও এডেন উপসাগরে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন একটি বহুজাতিক নৌ প্রতিরক্ষা জোট গঠন করেছে সৌদি আরব। শুরুতে ১৪টি দেশ এতে যোগ দিলেও আরও কয়েকটি দেশ ভবিষ্যতে জোটে যুক্ত হতে পারে বলে জানিয়েছে রিয়াদ।

জোটে যোগ দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে- বাহরাইন, বাংলাদেশ, কমোরোস, জিবুতি, মিসর, জর্ডান, কুয়েত, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, সোমালিয়া, সুদান, তুরস্ক ও ইয়েমেন।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা এবং লোহিত সাগরে ইরান-সমর্থিত হুথিদের হামলার মধ্যে সৌদি আরবের নেতৃত্বে এই জোট গঠনকে তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে জোটটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সদস্য দেশগুলো কতটা সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে তার ওপর।

কী ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরব?
বৃহস্পতিবার সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, মোট ১৫টি দেশ জোট গঠনের যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছে। এর মধ্যে ১৩টি দেশ ইতোমধ্যে নিজ নিজ দেশের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে জোটের সনদে স্বাক্ষর করেছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে সদস্যপদ নিশ্চিত করেছে।

এর আগে ৩০ জুলাই সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ বা বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের ঘোষণা দেয়। এর লক্ষ্য ছিল সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তায় সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করা।

সৌদি মন্ত্রণালয় জোটটিকে একটি ‘উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক জোট’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। অর্থাৎ জোটের লক্ষ্য ও নীতির সঙ্গে একমত যেকোনও দেশ এতে যোগ দিতে পারবে। ইতোমধ্যে আরও কয়েকটি দেশ সদস্য হওয়ার আবেদন করেছে বলেও জানিয়েছে রিয়াদ।

১৩ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, জোটের যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরকারী দেশের সংখ্যা ১৫-তে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ১৩টি দেশ নিজ নিজ জাতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে জোটের সনদে স্বাক্ষর করেছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে এতে যোগ দিয়েছে।

সৌদি আরবের জেদ্দায় ১৩ আগস্ট জোটটির তৃতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার পর এ ঘোষণা আসে।

সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এর মাধ্যমে জোটটি কেবল রাজনৈতিক ঘোষণার পর্যায় পেরিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও কার্যকরী কর্মকাণ্ড শুরুর পথে এগিয়েছে। অন্য সদস্যপ্রত্যাশী দেশগুলোও প্রয়োজনীয় জাতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে জোটে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

কীভাবে কাজ করবে এই জোট?
জোটটির কার্যক্রমের বিস্তারিত কাঠামো এখনও চূড়ান্ত করা হচ্ছে। তবে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সদস্য দেশগুলো নিজেদের মধ্যে তথ্য ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করবে।

এছাড়া যৌথ সামরিক পরিকল্পনা তৈরি, নৌ মহড়া ও প্রশিক্ষণ পরিচালনা, সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যৌথ নৌ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনাও রয়েছে।

জোটের কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে সৌদি নৌবাহিনীর রিয়ার অ্যাডমিরাল আবদুল্লাহ বিন সালেম আল-শেহরিকে। তিনি যৌথ নৌ প্রতিরক্ষা কার্যক্রম তদারক করবেন, সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করবেন এবং অন্যান্য সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোটের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখবেন।

জোটের সনদ অনুযায়ী বিভিন্ন সামুদ্রিক নিরাপত্তা মিশন পরিচালনার দায়িত্বও থাকবে তার ওপর।

কেন এখন এই জোট?
সৌদি নেতৃত্বাধীন নতুন এই জোটের ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাত উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামোকে ব্যাপকভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।

একই সঙ্গে সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে পরিচিত এই জলপথ দিয়ে আগে বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানির প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হতো।

হরমুজ প্রণালিতে কার্যত জাহাজ চলাচল বন্ধ বা ব্যাপকভাবে সীমিত হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও অর্থনীতির ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।

এর পাশাপাশি লোহিত সাগর-বাব আল-মান্দেব-এডেন উপসাগরীয় রুটেও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সৌদি পতাকাবাহী জাহাজগুলো ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি যোদ্ধাদের বারবার হামলার মুখে পড়েছে।

জোটটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাজি মনে করেন, নতুন সামুদ্রিক জোটটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে এর প্রকৃত গুরুত্ব নির্ভর করবে জোটটি বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে তার ওপর।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, এর আগেও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে এডেন উপসাগরে জলদস্যুতা মোকাবিলায় একাধিক আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গড়ে উঠেছিল।

তার মতে, এসব উদ্যোগের কিছু রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলো রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে বাস্তব নিরাপত্তা ব্যবস্থায় রূপ দিতে পারেনি।

নাজি বলেন, নতুন জোটের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। চুক্তি ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিকে যদি বাস্তব পদক্ষেপে রূপান্তর করে সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং অবাধ জাহাজ চলাচলের হুমকি মোকাবিলা করা যায়, তবেই এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

শুধু হুথিদের ঠেকানো নয়, বার্তা দিতে চায় সৌদি আরব
বিশ্লেষক নাজির মতে, সৌদি আরবের লক্ষ্য শুধু হুথিদের হামলা ঠেকানো নয়। রিয়াদ চায়, লোহিত সাগরে হুথিদের জাহাজে হামলাকে কেবল সৌদি আরবের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে না দেখে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হোক।

ইরান-সমর্থিত হুথিরা ২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে নেয়। এরপর থেকে তারা বন্দরনগরী এডেনভিত্তিক সৌদি-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে।

বর্তমান সংঘাত শুরুর পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। তেহরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি পতাকাবাহী জাহাজ এবং তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এর ফলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, হুথিরা একসময় বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে সেখানে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে।

বাব আল-মান্দেব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সামুদ্রিক পথ। এটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট।

সৌদি আরব একা লড়তে চায় না
নাজির মতে, রিয়াদের দৃষ্টিতে হুথিদের হামলার জবাব শুধু সৌদি আরবের একার দায়িত্ব হওয়া উচিত নয়। কারণ লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে এর প্রভাব সৌদি আরবের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর পড়ে।

তিনি বলেন, লোহিত সাগরে হুথিদের তৎপরতা এবং এর ফলে সৃষ্ট বাণিজ্যিক বিঘ্ন মোকাবিলায় বৃহত্তর আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।

তার ভাষায়, এখন পর্যন্ত জোটটি মূলত একটি প্রতিরক্ষামূলক জোট। হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণাত্মক অভিযান পরিচালনা করাই জোটের উদ্দেশ্য- এমন কোনও ইঙ্গিত এখনও পাওয়া যায়নি। তবে এর অর্থ এই নয় যে, হামলা অব্যাহত থাকলেও সৌদি আরব চুপ করে থাকবে।

নাজির মতে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে রিয়াদ কোনও এক পর্যায়ে হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সেক্ষেত্রে নতুন জোট সৌদি আরবকে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সমর্থনের কাঠামো দিতে পারে।

হুথিদের হামলার খরচ বাড়ানোই মূল লক্ষ্য
নাজির মতে, শেষ পর্যন্ত জোটটির প্রধান উদ্দেশ্য হবে হুথিদের হামলার মূল্য বা খরচ বাড়ানো এবং তাদের নিরুৎসাহিত করতে আরও শক্তিশালী প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা।

সৌদি আরব যে বার্তা দিতে চাইছে তা হলো- লোহিত সাগরে হুথিদের হামলা শুধু সৌদি স্বার্থে আঘাত করছে না। এসব হামলার কারণে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল, পণ্য পরিবহন এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই এটিকে শুধু একটি আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না।

জোটের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন
তবে নতুন এই জোটের সামনে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সদস্য দেশগুলোর রাজনৈতিক স্বার্থ, সামরিক সক্ষমতা ও পররাষ্ট্রনীতিতে পার্থক্য রয়েছে। ফলে কাগজে-কলমে একটি অভিন্ন অবস্থান তৈরি করা যতটা সহজ, বাস্তবে যৌথ সামরিক অভিযান বা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া ততটা সহজ নাও হতে পারে।

এছাড়া জোটটি কতটা শক্তিশালী গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে, সদস্য দেশগুলো কত দ্রুত একে অপরকে সহায়তা করতে পারে এবং হুথিদের মতো অপ্রচলিত যুদ্ধকৌশল ব্যবহারকারী একটি শক্তির বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে- সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সব মিলিয়ে, সৌদি নেতৃত্বাধীন এই জোট মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তায় নতুন একটি কাঠামো তৈরির সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এর প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে ঘোষণাপত্র বা সদস্য দেশের সংখ্যা দিয়ে নয়; বরং লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেবে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা বাস্তবে কতটা নিশ্চিত করতে পারে, তার ওপর। সূত্র: আল-জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights