শুভ জন্মবার্ষিকী আল মাহমুদ

ডা. উজ্জ্বল কুমার রায়

বধূবরণের নামে দাঁড়িয়েছে মহা মাতৃকুল
গাঙের ঢেউয়ের মতো বলো কন্যা কবুল কবুল।
অন্তর্গত আনন্দে ভাসা মেয়ের পিতৃগৃহ ছেড়ে যাবার বেদনাকে এমন করে কোন কবি লিখতে পেরেছেন?

মনে পড়ে সেই অসামান্য বিপ্লবমুখর অথচ কাব্যিক পংক্তিগুলো,
হিউয়েন সাং এর দেশে শান্তি নামে দেখো প্রিয়তমা
এশিয়ায় যারা আনে কর্মজীবী সাম্যের দাওয়াত
তাদের পোশাকে এসে এঁটে দেই বীরের তকোমা।

একাত্তরে তিনিও শরণার্থী হয়ে কলকাতা চলে গিয়েছিলেন। আনন্দবাজার সম্পাদক সাগরময় ঘোষের কাছে এপার বাংলার কয়েকজনের বই দেয়া হয়েছিল পড়তে। এই একজনকেই মনে ধরেছি তাঁর। অকুন্ঠ চিত্তে প্রশংসা করে লিখেছিলেন তাঁকে নিয়ে।

মুক্তিযুদ্ধের সেই কঠিনও উজ্জ্বল সময়ে এই চালচুলোহীন কবির কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেছিল অরুণা প্রকাশনী।। কবির খেরোখাতায় যা কয়েকটা কবিতা তা দিয়ে বই হয় না। বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছিল যদি কারো কাছে তাঁর কবিতা থেকে থাকে। সবাইকে চমকে দিয়ে বেশ কয়েকটা কবিতা দিয়ে গেছিলেন বর্ধমানের এক চাষী। দেয়ারই কথা। তাঁর কবিতায় মাটি ঘাম লোবান নারী মিশে যে একাকার।
তাঁর কাছে জেনেছি
কবিতা হলো, আমার মায়ের নামে খুলে যাওয়া দক্ষিণের ভেজানো কবাট।
কবিতা সে তো মক্তবের মেয়ে চুল খোলা আয়েশা আক্তার।
চুল ঢাকা বাঙালি নারীদের জন্য বড় দরকার এই ক’টি পংক্তি।

সামান্য প্রুফ রিডার তখন। ইত্তেফাক অফিসের ড্রয়ারে ফেলে যাওয়া ছড়ার পান্ডুলিপি থেকে যা কিছু স্মৃতিতে তা নিয়ে কলকাতা থেকে বের হলো, পাখির কাছে ফুলের কাছে। সেখান থেকেই বাঙালি পেলো,

প্রভাত ফেরী প্রভাত ফেরী
আমায় নেবে সঙ্গে?
বাংলা আমার বচন আমি
জন্মেছি এই বঙ্গে।

তুমুল দেশপ্রেম না থাকলে একজন কবি বলতে পারেন না,
খবরদার আমার মা কে যেন কেউ গোলামের গর্ভধারিণী না বলে।

তাঁর গল্প পড়ে বুঝতে পেরেছিলাম যৌন উত্তেজনা আর শৈল্পিক যৌনতার তফাৎ কি। জলবেশ্যা, পান কৌড়ির রক্ত বাংলা সাহিত্যে অনন্য সংযোজন।অদ্যাবধি অনতিক্রম্য এইসব গল্প চূড়ান্ত আধুনিক।

তারপর যা হয়, একসময় ইনি চাপে, অ চাপে, ইচ্ছায় বা প্রলোভন কিংবা মনোজাগতিক তাড়নায় পথ বদলালেন। তাঁর এই মত বদলানো দেশের প্রগতির সাথে মিললো না,আর এটাই তাঁকে আলাদা করে ফেললো।

আমি জানি এই লেখাটি অনেকের পছন্দ হবে না। অনেকের ভালো লাগলেও মুখ বন্ধ থাকবে। ইচ্ছে থাকলেও আঙুল চলবে না। কারণ ও আমরা জানি। কিন্তু একটা প্রশ্ন করতেই হয়, কবি কি ডাকাত,লুটেরা, লুচ্চা বা রাজাকার কেউ ছিলেন?
যে সমাজে রোজ ডাকাত পয়দা হয়, লুটেরা দেশ ছেড়ে ভাগে, রাজনীতির নামে দল বদলানোর কোট বদলানোর উৎসব চলে সেখানে সব রাগ আর ক্রোধ শুধু একজন কবির ওপরে কেন?
কেন আমরা তাঁকে তাঁর সোনালী কাবিন লোক লোকান্তরের জন্য ক্ষমা করে দিতে পারি না?

যারা আমায় গালাগাল করতে চান তাদের মনে করিয়ে দেই, আমার চাইতে অনেক বড় অনেক প্রতিভাবান বিখ্যাত কবি জয় গোস্বামী বাংলাদেশে এসে নিজে তাঁর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন। পা ছুঁয়ে প্রণাম জানাতে।

এখন তিনি সব কিছুর বাইরে। সব আলোচনা সমালোচনার ঊর্ধ্বে। শুধু তাঁর লেখা কানে বাজে,
অামার মায়ের সোনার নোলক
হারিয়ে গেলো শেষে
হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি
সারা বাংলাদেশে…..

শুভ জন্মদিন আল মাহমুদ প্রিয় ছড়াকার প্রিয় কবি।

লেখক: চিকিৎসক ও বহুমাত্রিক লেখক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights