সিউলের জবাবে উত্তর কোরিয়ার পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা
অনলাইন ডেস্ক
সিউলের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের কয়েক ঘণ্টার পর পাল্টা জবাব দিয়েছে উত্তর কোরিয়া। শনিবার (৩ অক্টোবর) দেশটি জানিয়েছে, তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে একটি মাঝারি-পাল্লার কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে।
সামরিকীকরণ-মুক্ত অঞ্চলে বিস্ফোরণের ঘটনায় দক্ষিণ কোরিয়ার তিন সেনা আহত হওয়ার ঘটনায় পিয়ংইয়ংয়ের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছিল সিউলের সেনাবাহিনী। এই বিস্ফোরণের জন্য তারা উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করেছিল। সেই ঘটনার কয়েক দিন পরেই এই উৎক্ষেপণের ঘটনাটি ঘটল।
তবে গত মাসের বিস্ফোরণের দায় অস্বীকার করেছে পিয়ংইয়ং। স্থানীয় সময় শুক্রবার (২ অক্টোবর) দক্ষিণ কোরিয়াকে ‘ঘৃণ্য’ বলে অভিহিত করেছে, যা আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার জন্য সিউলের বেসামরিক নেতৃত্বের প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করেছে।
শনিবার ভোরের দিকে সিউলের জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফ জানিয়েছে, তাদের সেনাবাহিনী উত্তর কোরিয়ার ওনসান এলাকা থেকে পূর্ব সাগরের (যা জাপান সাগর নামেও পরিচিত) দিকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ শনাক্ত করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপান উত্তর কোরিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা অবস্থান বজায় রাখছে। এতে আরও উল্লেখ করা হয়, ক্ষেপণাস্ত্রটি ৭০০ কিলোমিটারেরও (৪৩৫ মাইল) বেশি পথ পাড়ি দিয়েছে।
এর কয়েক ঘণ্টা পর পিয়ংইয়ংয়ের নেতা কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জং জানান, সকালে উৎক্ষেপিত ক্ষেপণাস্ত্রটি ছিল একটি ‘মাঝারি-পাল্লার কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র’। তিনি বলেন, এই ক্ষেপণাস্ত্রটি ‘স্বল্প উচ্চতায় তার উড্ডয়ন পথ পরিবর্তন করতে সক্ষম এবং এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করা হয়েছে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।
কিম জং উনের বোন দাবি করেন, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত ‘এড়ানোর কোনো উপায় নেই’ এবং কিম জং উন বিশ্বাস করেন, বিশ্বের কোনো দেশই অন্তত আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এমন প্রযুক্তির নাগাল পাবে না। তার এই সাম্প্রতিক বক্তব্যের আগে গত মাসে কিম জং উন দেশের অস্ত্র ব্যবস্থায় ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মান’ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছিলেন।
কিম ইয়ো জং আরও দাবি করেন, যখনই উত্তর কোরিয়া ‘ঢেউ-সদৃশ গতিপথের পদ্ধতি’ প্রয়োগ করেছে, তখন দক্ষিণ কোরিয়া তাদের প্রাথমিক ‘স্কিপ পয়েন্ট’ বা লাফিয়ে ওঠার বিন্দু থেকেই লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে।বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সহায়তার জন্য সেনা পাঠানোর বিনিময়ে রাশিয়ার সামরিক সহায়তায় উত্তর কোরিয়া দ্রুত তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির উন্নতি ঘটাচ্ছে।
সিউল-ভিত্তিক ‘কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর মিলিটারি অ্যাফেয়ার্স’-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক হং সুং-পিও এএফপি-কে বলেছেন, বিশ্বজুড়ে সামরিক প্রযুক্তিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-র ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও এর ব্যতিক্রম নয়। লক্ষ্যবস্তু সংক্রান্ত তথ্য ও উৎক্ষেপণ কার্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহায়তা করতে পারে। এছাড়া ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধগুলো দেখিয়েছে, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের সাথে এআই-এর সমন্বয় কীভাবে এগুলোর কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
হং বলেন, ক্ষেপণাস্ত্রটির সক্ষমতা নিয়ে উত্তর কোরিয়ার দাবি সঠিক কি না, সে বিষয়ে এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো খুব তাড়াহুড়ো হবে। তিনি বলেন, শীর্ষস্থানীয় সামরিক শক্তিগুলোর তুলনায় উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি খুব একটা উন্নত নয়। যদিও যাত্রাপথের শেষ পর্যায়ে (টার্মিনাল ফেজ) গতিপথ পরিবর্তনকারী ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে প্রতিহত করা কঠিন। তবে এসব ক্ষেপণাস্ত্র নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
সিউল এবং যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘ কমান্ডের তদন্তে দেখা গেছে, গত মাসে ডিএমজেড বা অসামরিকীকৃত অঞ্চলের ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটেছিল, তা ছিল সীমান্তের দক্ষিণ দিকে উত্তর কোরিয়ার পুঁতে রাখা মাইন-এর কারণে।দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা কাং শিন-চুল-এর মতে, বিস্ফোরণের জন্য দায়ী মাইনগুলোর তিনজন সৈন্য আহত হয়েছিলেন। পিয়ংইয়ংয়ের সীমান্ত দুর্গ তৈরির কাজের অংশ হিসেবেই সেখানে বসানো হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সিউলের ইউনিভার্সিটি অফ নর্থ কোরিয়ান স্টাডিজ-এর সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়াং মু-জিন এএফপি-কে বলেন, সিউল উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু পিয়ংইয়ং তার জবাবে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর বার্তা হলো, সদিচ্ছার জবাবে উত্তর কোরিয়া সংঘাতের পথ বেছে নিচ্ছে।
সূত্র: এএফপি।
