সীমান্তে কার্টেল ড্রোন ঠেকাতে নতুন প্রযুক্তি পরীক্ষা যুক্তরাষ্ট্রের
অনলাইন ডেস্ক
মেক্সিকো সীমান্তে মাদক চোরাকারবারি ও মানবপাচারকারী চক্রের ড্রোন ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে থাকায় নতুন করে প্রতিরোধব্যবস্থা জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র। এর অংশ হিসেবে দেশটির সেনাবাহিনী সীমান্ত এলাকায় ছোট ড্রোন শনাক্ত, অনুসরণ ও ধ্বংসের জন্য অত্যাধুনিক কাউন্টার-ড্রোন প্রযুক্তি পরীক্ষা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, সীমান্তে কার্টেলগুলোর ড্রোন ব্যবহার ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোননির্ভর যুদ্ধের যে দ্রুত বিকাশ ঘটেছে, তার সঙ্গে পুরোপুরি তুলনীয় নয়। তবে নতুন প্রযুক্তি পরীক্ষা, সেনাদের প্রশিক্ষণ এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে বিভিন্ন প্রতিরোধব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য সীমান্ত এলাকা গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষাক্ষেত্র হয়ে উঠছে।
৩০ দিনে ৩৭৮টি ড্রোন অনুপ্রবেশ
অ্যারিজোনায় গত সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত মার্কিন নর্দার্ন কমান্ডের একটি সামরিক মহড়া ‘ফ্যালকন পিক’-এ সেনারা বিভিন্ন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের তৈরি কাউন্টার-ড্রোন প্রযুক্তি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেন।
মহড়ায় প্রদর্শিত প্রযুক্তির মধ্যে ছিল ড্রোন শনাক্ত করার রাডার, শত্রু ড্রোন ঠেকাতে ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর ড্রোন, স্বয়ংক্রিয় বন্দুকব্যবস্থা এবং ছোট আকারের মানববিহীন উড়োজাহাজ শনাক্ত, অনুসরণ ও ধ্বংসের অন্যান্য প্রযুক্তি।
জয়েন্ট টাস্ক ফোর্স সাউদার্ন বর্ডারের অপারেশনবিষয়ক উপকমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ব্রায়ান ফিলার সাংবাদিকদের বলেন, আগের ৩০ দিনে মার্কিন সামরিক বাহিনী সীমান্তে ৩৭৮টি ড্রোন অনুপ্রবেশের ঘটনা শনাক্ত করেছে। তার ভাষ্য, এই প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে।
ফিলার বলেন, সীমান্তে শনাক্ত হওয়া ড্রোনগুলোর বেশির ভাগই বাজারে সাধারণভাবে পাওয়া যায় এমন বাণিজ্যিক ড্রোন। এগুলোর অধিকাংশে নজরদারি ক্যামেরা থাকে এবং সীমান্ত অতিক্রমের বিভিন্ন তৎপরতার সময় এসব ড্রোনকে প্রায়ই দেখা যায়।
নজরদারি ও চোরাচালানে ড্রোন
মার্কিন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, মেক্সিকো সীমান্ত অতিক্রমকারী ড্রোনগুলোর বড় অংশ কার্টেল বা অপরাধী চক্র নজরদারির কাজে ব্যবহার করে। বিশেষ করে মাদক চোরাচালান ও মানবপাচারের সময় সীমান্তের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে এসব ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে।
বাণিজ্যিকভাবে সহজলভ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করায় অপরাধী চক্রগুলোর জন্য ড্রোন সংগ্রহ ও পরিচালনা করা তুলনামূলকভাবে সহজ। ফলে সীমান্তে শুধু জনবল ও প্রচলিত নজরদারি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে আকাশপথের এই নতুন হুমকি মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
এরই মধ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, আগস্টে দক্ষিণ সীমান্তে লেজার প্রযুক্তি মোতায়েনের পর কার্টেলগুলোর ১১টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শিক্ষা
ড্রোন মোকাবিলার এই প্রযুক্তি উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনাকারীরা ইউক্রেনের যুদ্ধ থেকেও শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন যুদ্ধের চরিত্র আমূল বদলে দিয়েছে। নজরদারি, লক্ষ্য শনাক্তকরণ, হামলা এবং প্রতিরোধ- প্রায় সব ক্ষেত্রেই ছোট ও তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এর পাশাপাশি ড্রোন প্রতিহত করার প্রযুক্তিও দ্রুত উন্নত হচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন হুমকির ভিত্তিতে অল্প সময়ের মধ্যে প্রযুক্তি পরিবর্তন ও উন্নয়নের যে ধারা তৈরি হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা সেটি নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োগ করতে চাইছেন।
তবে কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, মেক্সিকো সীমান্তে কার্টেলগুলোর ব্যবহৃত ড্রোন এবং ইউক্রেন বা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক সামরিক ড্রোন এক নয়।
তবু সীমান্তকে বাস্তব পরিবেশে নতুন প্রযুক্তি পরীক্ষার জন্য কার্যকর জায়গা হিসেবে দেখা হচ্ছে। নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষাগারের পরিবর্তে বাস্তব পরিস্থিতিতে যন্ত্রপাতির সক্ষমতা যাচাই, সেনাদের প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তির দুর্বলতা শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে সেখানে।
প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে বেসরকারি কোম্পানির উত্থান
ফ্যালকন পিক মহড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা খাতে নতুন ধরনের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ক্রমবর্ধমান ভূমিকার বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে।
রাশিয়ার ২০২২ সালের আগ্রাসনের পর থেকে বিনিয়োগকারীরা ড্রোন ও কাউন্টার-ড্রোন প্রযুক্তি তৈরিকারী বিভিন্ন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। এর মধ্যে অ্যান্ডুরিল, শিল্ড এআই ও স্যারোনিক-এর মতো কোম্পানি রয়েছে। এছাড়া সামরিক চুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে ছোট আকারের অসংখ্য ড্রোন ও কাউন্টার-ড্রোন স্টার্টআপও গড়ে উঠেছে।
মহড়ায় অ্যান্ডুরিলের ‘ঘোস্ট’ ড্রোন প্রদর্শন করা হয়। একই সঙ্গে টেলিডাইন ফ্লির-এর তৈরি রাডার ও ক্যামেরাভিত্তিক ড্রোন শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, অ্যালেন কন্ট্রোল সিস্টেমস-এর ‘বুলফ্রগ’ স্বয়ংক্রিয় কাউন্টার-ড্রোন মেশিনগান এবং পাওয়ারাস-এর তৈরি ইন্টারসেপ্টর ড্রোনও প্রদর্শন করা হয়।
দ্রুত প্রযুক্তি বদলের চেষ্টা
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন প্রযুক্তি শুধু সংগ্রহ করাই তাদের লক্ষ্য নয়; বরং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত প্রযুক্তি পরিবর্তন ও উন্নয়ন করার সক্ষমতাও তৈরি করতে চান তারা।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ম্যাট রস বলেন, ইউক্রেনের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রযুক্তি ও কৌশল দ্রুত পরিবর্তন করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রেরও সেই প্রক্রিয়াটি নিজেদের সামরিক ব্যবস্থায় অনুসরণ করা উচিত।
তার ভাষায়, ইউক্রেনের অভিজ্ঞতা থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো দ্রুত অভিযোজনের সক্ষমতা।
সীমান্তই নতুন পরীক্ষাগার
মার্কিন সেনাবাহিনীর জন্য মেক্সিকো সীমান্ত এখন তাই শুধু অভিবাসন, মাদক চোরাচালান বা মানবপাচার ঠেকানোর জায়গা নয়; নতুন প্রজন্মের ড্রোন প্রতিরোধ প্রযুক্তি পরীক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।
কার্টেলগুলোর বাণিজ্যিক ড্রোন ব্যবহার বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্র এমন প্রযুক্তি তৈরি করতে চাইছে, যা কম খরচের ছোট ড্রোন দ্রুত শনাক্ত করতে এবং প্রয়োজন হলে সেগুলোকে নিষ্ক্রিয় করতে পারবে।
রাডার, ক্যামেরা, ইন্টারসেপ্টর ড্রোন, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ও লেজার- বিভিন্ন প্রযুক্তিকে একসঙ্গে ব্যবহার করে একটি সমন্বিত প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন ওয়াশিংটনের অন্যতম লক্ষ্য।
ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়েছে, ভবিষ্যতের সংঘাতে ড্রোন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের একটি সহায়ক অস্ত্র নয়; বরং নজরদারি থেকে শুরু করে হামলা ও প্রতিরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠতে পারে। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় মেক্সিকো সীমান্তে কার্টেলগুলোর ড্রোন মোকাবিলাকে যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতের বড় ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের একটি পরীক্ষাক্ষেত্র হিসেবেও দেখছে। সূত্র: রয়টার্স
