স্বর্ণের খোঁজে গিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি, ১০ দিন পর উদ্ধার ৫ খনিশ্রমিক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১০ দিনের চরম অনিশ্চয়তা আর মৃত্যুর মুখ থেকে অবশেষে ফিরে এলেন লাওসের প্লাবিত গুহায় আটকে থাকা বাকি চার খনিশ্রমিকও। শনিবার (৩০ মে) বিকেলে তাদের সফলভাবে গুহার বাইরে বের করে আনা সম্ভব হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে থাইল্যান্ডের উদ্ধারকারী দল। এর ঠিক একদিন আগেই প্রথম ব্যক্তিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এক অভিযানের মাধ্যমে নিরাপদে বের করে এনেছিলেন ডুবুরিরা। ফলে গুহার ভেতর জীবিতাবস্থায় খুঁজে পাওয়া পাঁচজন শ্রমিককেই সফলভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হলো।

তবে এই দলের সঙ্গে থাকা অন্য দুই গ্রামবাসীর সন্ধান এখনো মেলেনি, যাদের খোঁজে তল্লাশি জারি রেখেছেন উদ্ধারকারীরা।

গত ২০ মে জাইসোম্বুন প্রদেশের দুর্গম পাহাড়ি এলাকার এক প্রত্যন্ত গুহায় সোনার খোঁজে প্রবেশ করেছিলেন সাতজন স্থানীয় বাসিন্দা। কিন্তু তারা ভেতরে থাকা অবস্থাতেই আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও বন্যা দেখা দিলে গুহার প্রবেশপথ পুরোপুরি তলিয়ে যায় এবং সংকীর্ণ সুড়ঙ্গের ভেতর আটকা পড়েন তারা। দীর্ঘ এক সপ্তাহ নিখোঁজ থাকার পর গত বুধবার উদ্ধারকারীরা গুহার মুখ থেকে প্রায় ৩০০ মিটার ভেতরে পাঁচজনকে জীবিত অবস্থায় খুঁজে পান। উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন, মাটির গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত এই গুহা ব্যবস্থাটি অত্যন্ত দুর্গম এবং এর ভেতরের কিছু সুড়ঙ্গ এতটাই সরু যে তার চওড়া মাত্র ৫০ সেন্টিমিটার বা ২০ ইঞ্চির মতো। ফলে এমন সংকীর্ণ ও পানিতে নিমজ্জিত সুড়ঙ্গ দিয়ে মানুষকে বের করে আনা ছিল একপ্রকার অসম্ভব মিশন।

থাইল্যান্ডের উদ্ধারকারী ডুবুরি দলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ থেকে জানানো হয়, স্থানীয় সময় শনিবার বিকেল ৩টা ১০ মিনিটে চারজন শ্রমিককেই একে একে গুহা থেকে বের করে আনা হয়। তবে ঠিক কোন কৌশল বা পদ্ধতিতে তাদের বের করা হয়েছে, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

উদ্ধারকর্মীদের একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, চারজন শ্রমিক গুহার মুখ দিয়ে বের হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে উপস্থিত অনুসন্ধানকারী দল ও উৎসুক জনতার মধ্যে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের একজন মুখে চওড়া হাসি নিয়ে অস্থায়ী মেডিকেল তাঁবুর দিকে হেঁটে যান, অন্যদিকে বাকি তিনজনকে উদ্ধারকারীদের জড়িয়ে ধরে আবেগাপ্লুত হয়ে কাঁদতে দেখা যায়। দীর্ঘদিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ফিরে আসার এই আবেগঘন মুহূর্তে পুরো এলাকায় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। পরে তাদের স্ট্রেচারে শুইয়ে ফয়েল ব্ল্যাঙ্কেট দিয়ে ঢেকে দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া শুরু হয়।

এই অলৌকিক উদ্ধার অভিযানের আগে বিশেষজ্ঞরা গুহার ভেতরের পানি পাম্প করে সেচে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন, যাতে সুড়ঙ্গটি চলাচলের উপযোগী হয়। কিন্তু বন্যার পানির তীব্রতার কাছে সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর, শেষ উপায় হিসেবে আটকে পড়া সাধারণ মানুষদের দ্রুত স্কুবা ডাইভিং এবং পানির নিচে সাঁতার কাটার প্রশিক্ষণ দিয়ে বের করে আনার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত আলোচনা করা হচ্ছিল। লাওসের এই উদ্ধার অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়তেই আন্তর্জাতিক ডুবুরি সম্প্রদায় সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়। থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ফ্রান্স এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা বিশেষজ্ঞ ডুবুরিদের সমন্বিত প্রচেষ্টাতেই এই অসম্ভবকে সম্ভব করা গেছে।

পুরো এই ঘটনাটি ২০১৮ সালে থাইল্যান্ডের থাম লুয়াং গুহায় কিশোর ফুটবল দলের আটকে থাকার সেই বিশ্ব কাঁপানো ঘটনাকে মনে করিয়ে দিয়েছে, যেখানেও দীর্ঘ ১৮ দিন পর সবাইকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল।

সূত্র: বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights