হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে স্বচ্ছ
বিশেষ প্রতিনিধি
জুলাই গণ অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান -পিআইডি
ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হতাহতদের পরিবারের শোকাহতদের আশ্বস্ত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য উপায়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সংঘটিত প্রতিটি হত্যার বিচার হবে। তিনি বলেন, জুলাই গণ অভ্যুত্থানের একক কৃতিত্বের দাবিদার কোনো দল বা ব্যক্তি নয়। এই ঐতিহাসিক গণ অভ্যুত্থানের মহানায়ক বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ। দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ আশা করে, এই জুলাই স্মৃতি জাদুঘর কোনো একটি দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির একক রাজনৈতিক ভাষ্য প্রতিষ্ঠার স্থান হবে না। ২০২৪ সালের গণ অভ্যুত্থানে কোনো একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা দলের কৃতিত্ব নেই। গতকাল সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জুলাই গণ অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন শেষে ‘জুলাই ৩৬’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব কথা বলেন।

জুলাই স্মৃতি জাদুঘরপ্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার মনে করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্যই প্রতিটি অপরাধের বিচার হওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিগত ১৭ বছর এবং জুলাই আন্দোলনে যে মানুষগুলো শহীদ এবং গুম-খুনের শিকার হয়েছেন, তাদের নামে নিজেদের এলাকায় যেকোনো একটি প্রতিষ্ঠানের নামকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তাঁর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন, প্রেস সচিব সালেহ শিবলী ও অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানও উপস্থিত ছিলেন।
স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা। পরে জুলাই গণ অভ্যুত্থানে শহীদ আবদুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমা তুজ জোহরা, শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং জুলাই যোদ্ধা নিশাত তাবাসসুম প্রাপ্তি আবেগঘন স্মৃতিচারণ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের। আর ২০২৪ সালের গণ অভ্যুত্থান ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার। একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের মানুষ যেমন ভুলে যায়নি, একইভাবে ২০২৪ সালের গণ অভ্যুত্থানের শহীদদেরকেও জনগণ কখনোই ভুলবে না।
দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা সম্পর্কে সতর্ক করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে কেউ কেউ অহেতুক ইস্যু তৈরি করে এ পরিস্থিতিতে তারা নিজেদের অজান্তেই পতিত ও পলাতক স্বৈরাচারের পুনরুত্থানের পথ সুগম করছেন কি না, সেটি ভেবে দেখার আহ্বান জানাই। দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনের ভয়াবহতা স্মরণ করে তিনি বলেন, আজকের এই দিনটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে আরেকটি যুগান্তকারী মাইলফলক। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষ গুম ও অপহরণের শিকার হয়েছিলেন। লাখ লাখ মানুষ নির্যাতন, নিপীড়ন, হামলা ও মিথ্যা মামলায় বছরের পর বছর ঘরবাড়ি ছাড়া হয়েছিলেন। শুধু জুলাই-আগস্টের গণ অভ্যুত্থানেই শহীদ হয়েছেন হাজারো ছাত্র-জনতা, নারী ও শিশু। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই-আগস্টের গণ অভ্যুত্থান ঠেকাতে ফ্যাসিস্ট চক্র হেলিকপ্টার থেকে গুলি করেও গণতন্ত্রকামী জনগণকে হত্যা করেছিল। পতিত, পরাজিত ও বিতাড়িত ফ্যাসিস্টদের এমন নৃশংসতা ও বর্বরতা সভ্য জগতে বিরল। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গুম-খুন ও অপহরণকে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত করে ফেলা হয়েছিল। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই নৃশংসতা শুধু স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে তিন বছরের দুঃশাসনের সঙ্গেই তুলনা চলে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণ অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তাদের পূর্বসূরিদের সাহসী ইতিহাস তুলে ধরবে। এই জাদুঘর নতুন প্রজন্মের সামনে উন্মোচিত করবে বিতাড়িত ফ্যাসিস্টদের মুখোশ। এই স্মৃতি জাদুঘর আমাদের জনগণের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, বেদনা, সাহস ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে জাতীয় স্মৃতিতে স্থায়ীভাবে ধারণ করার এক ঐতিহাসিক উদ্যোগ। প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, শুধু জুলাই গণ অভ্যুত্থানই নয়, এখানে বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাসও সংরক্ষিত থাকা জরুরি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অসম্পূর্ণ, অতিরঞ্জিত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান ইতিহাসকে শক্তিশালী করে না; বরং ইতিহাসের বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করে এবং ভবিষ্যৎ বিভেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং, প্রতিটি বিষয়ে যথাসম্ভব সত্যতা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জাদুঘরে রাখা বিষয়াবলি সম্পর্কে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি এবং অন্যান্য ভাষায়ও উপস্থাপিত হলে বিশ্বের ভিন্নভাষী মানুষেরও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে সুবিধা হবে। আহত জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন ও চিকিৎসার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণ অভ্যুত্থানে আহত যোদ্ধাদের সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি গুরুতর আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে ৫০ জন জুলাই যোদ্ধা বিদেশে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গেজেটভুক্তদের মধ্যে ১৩ হাজারের বেশি জুলাই যোদ্ধাকে তাদের নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে শ্রেণিভিত্তিক মাসিক সম্মানী ভাতা পাঠানো হচ্ছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হতাহতদের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সহায়তা করার ব্যাপারে বর্তমান সরকার আন্তরিক। রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি বর্তমান সরকার শহীদদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠারও কাজ শুরু করেছে। এরই অংশ হিসেবে দেশ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে বিএনপির ৩১ দফা ও নির্বাচনি ইশতেহারের পাশাপাশি জাতীয় সংসদের সাউথ প্লাজায় স্বাক্ষরিত জুলাই সনদও পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তারেক রহমান বলেন, একই সঙ্গে গণভোটের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে গঠিত সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিও কাজ শুরু করেছে। দেশ পুনর্গঠনের মাধ্যমে স্বনির্ভর, সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক দেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা শহীদদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ব, ইনশা আল্লাহ। বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রী গণ অভ্যুত্থানে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সেনাবাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং শোকাহত শহীদ পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশ আর কখনো কোনো তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হবে না।
জুলাই যোদ্ধা মিতুর খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী : জুলাই গণ অভ্যুত্থানে আহত যোদ্ধা মিতুর খোঁজ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আহত যোদ্ধা মিতু হাসপাতালের শয্যা থেকে গতকাল সরাসরি ‘জুলাই গণ অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন। এ সময় তাঁকে কাছে ডেকে কথা বলেন এবং শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন।
জাদুঘরের দুয়ার খুলেছে : উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে আজ থেকে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের দুয়ার সবার জন্য উন্মুক্ত হলো।
জুলাই স্মৃতি জাদুঘর গতকাল উদ্বোধন করে পরিদর্শন করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ মন্ত্রী ও উপদেষ্টারা -বাংলাদেশ প্রতিদিন
দদের স্মরণে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে দেওয়া পুষ্পমাল্যে ভরে ওঠে শাহবাগের শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ
