হারিয়ে যাচ্ছে দেশি মাছ

জিন্নাতুন নূর
‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ প্রবাদটি একসময় বেশ জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু এখন জেলেদের জালে আর আগের মতো দেশি মাছ মিলছে না। বাজারে যা পাওয়া যাচ্ছে তার দামও আকাশছোঁয়া, যা সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে। সম্প্রতি প্রকাশিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ম্যারিটাইম ইউনিভার্সিটির প্রকাশিত গবেষণায় টাঙ্গুয়ার হাওরে দেশি মাছের প্রজাতি কমে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, বাচা, কাজলি, বাতাসি, লাল খলশে, চুচিয়া, ঢেলা, মলা, মহাশোল, গাংমাগুর, চিতল, রিঠার মতো দেশি মাছগুলোর কিছু একেবারেই জেলেদের জালে উঠছে না, আর কিছু প্রজাতির মাছ জালে উঠলেও তার সংখ্যা খুব কম। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টাঙ্গুয়ার হাওরের দেশি মাছ রক্ষায় সরকারকে এখানে অবৈধ ও অতিরিক্ত মাছ শিকারের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে হাওরের অবশিষ্ট মাছের দ্রুত বিলুপ্তির আশঙ্কা রয়েছে। ‘বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটি স্ট্যাটাস অব ফিশ জেনেটিক রিসোর্সেস অ্যাট টাঙ্গুয়ার হাওর ওয়েটল্যান্ড ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, আগে এ হাওর থেকে স্থানীয় জেলেরা ১৪১ প্রজাতির মাছ ধরতেন, তা কমে এখন মাত্র ৫৮-তে নেমে এসেছে। এর মধ্যে ১৬ প্রজাতির মাছ (২৮ শতাংশ) সহজলভ্য হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ১৮ প্রজাতির মাছ (৩১ দশমিক ০৮ শতাংশ) মোটামুটি পাওয়া যায়। ১২ প্রজাতির মাছ (২০ দশমিক ৬৮ শতাংশ) খুব কম পরিমাণে পাওয়া যাচ্ছে। আর ১২ প্রজাতির মাছ (২০ দশমিক ৬৮ শতাংশ) একেবারেই বিরল। পরিমাণে কম পাওয়া এবং বিরল প্রজাতির মাছগুলোকে সংকটাপন্ন হিসেবে ধরা হচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এ মাছগুলো আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে। জেলেরা জানান, হাওরের আট প্রজাতির মাছ তারা একেবারেই জালে পাচ্ছেন না। গবেষণা অনুযায়ী, আগে পাওয়া ১৪১ প্রজাতির মধ্যে ৪১ শতাংশ (৫৮ প্রজাতি) মাছ পাওয়া গেছে। বাকি ৫৯ শতাংশ (৮৩ প্রজাতি) মাছ হারাতে বসেছে বা একেবারেই হারিয়ে গেছে। জাতীয় সংরক্ষণ কৌশল-মৎস্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রায় ১৪১ মাছের প্রজাতি আছে। আর প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন আইইউসিএনের ২০১৫ সালের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় ১৩৪ প্রজাতির কথা। অথচ একসময় টাঙ্গুয়ার হাওর বৈচিত্র্যপূর্ণ মাছের জন্য সমৃদ্ধ জলাভূমি ছিল। এটি ছিল হাওরের আশপাশের মানুষের জীবিকার উৎস। বাংলাদেশে মিঠাপানির মোট মাছের প্রজাতি আছে ২৬০টি; যার ১৪১টি ছিল টাঙ্গুয়ার হাওরের। সেই হাওরে এখন আছে ৫৮ প্রজাতির মাছ। এ হাওরে শীত মৌসুমে একটি গবেষণা জরিপ চালানো হয়। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও ধর্মসাগর উপজেলায় এ গবেষণা পরিচালিত হয়। পুরো গবেষণায় মাছের উপস্থিতির যে চিত্র পাওয়া গেছে, তা এ জলাভূমির জন্য খুবই উদ্বেগের। টাঙ্গুয়ার হাওরে বিভিন্ন আকৃতির ২০০ বিল এবং ৪৬টি গ্রাম আছে। মোট হাওর এলাকা প্রায় ১১৪ কিমি। এর মধ্যে ২ হাজার ৮০২ দশমিক ৩৬ হেক্টর জলাভূমি। গবেষণায় দেখা গেছে, হাওরে যে মাছগুলো সহজলভ্য তার মধ্যে আছে টেংরা, বোয়াল, আইড়, মেনি, চাপিলা, কাকিলা, বেলে, গোল চান্দা, গুতুম, পটকা, তিত পুন্তি, কালো চিংড়ি। আর যে মাছগুলো হাওরে খুব কম পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো হচ্ছে বাচা, কাজলি, বাতাসি, লাল খলশে, চুচিয়া, ঢেলা ও মলা।। যে মাছগুলো হাওরে একেবারেই মিলছে না সেগুলো হচ্ছে নানিদ, মহাশোল, গাংমাগুর, চিতল, রিঠা। সিলেট এগ্রিকালচার ইউনিভার্সিটির অ্যাকুয়াটিক রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক মৃত্যুঞ্জয় কু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘হাওরে নিষিদ্ধ সামগ্রী দিয়ে অতিরিক্ত মাছ শিকারের কারণে মাছের সংখ্যা দ্রুত কমে আসছে। অন্যদিকে বর্ষাকালে ভারতের মেঘালয় থেকে বৃষ্টির পানি হাওরে নেমে এলে পানি ঘোলা হয়ে যায়। মেঘালয়ের কোল মাইনিংয়ের ময়লা এ পানির সঙ্গে সুনামগঞ্জের হাওরের ওপর পড়লে পানি দূষিত হয়। আবার বর্তমানে টাঙ্গুয়ার হাওরে বড় বড় হাউসবোটে পর্যটকদের আনাগোনা বেড়েছে। এতে মাছের প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় ইলিশের ডিম ছাড়ার জন্য যেমন বছরের একটি সময় মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে, একইভাবে টাঙ্গুয়ার হাওরেও বছরের একটি সময় মাছ ধরা নিষিদ্ধ করতে হবে। হাওরে অতিরিক্ত মাছ শিকার বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights