২০৩০ সালে মাছ রপ্তানির লক্ষ্য ১০০ কোটি ডলার
শাহেদ আলী ইরশাদ
২০৩০ সালের মধ্যে মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্যের রপ্তানি আয় ১০০ কোটি ডলারে উন্নীত করতে চায় সরকার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ আয় ছিল প্রায় ৪৫ কোটি ডলার। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সামুদ্রিক চাষ, কাঁকড়া উৎপাদন, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা এবং সমুদ্রভিত্তিক নতুন শিল্প বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও গবেষণার ঘাটতি এবং নীতিমালার বাস্তবায়ন এ লক্ষ্য অর্জনে বড় চ্যালেঞ্জ।
বঙ্গোপসাগরের বিপুল সম্পদ কাজে লাগাতে সরকার একাধিক খসড়া নীতিমালা ও নির্দেশিকা তৈরি করেছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য উৎপাদন বাড়ানো, রপ্তানিপণ্যের বৈচিত্র্য আনা এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ।
উৎপাদনে সাফল্য, রপ্তানিতে চ্যালেঞ্জ : জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০২৬ সালের জুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নদী, হ্রদ ও জলাভূমি থেকে মাছ আহরণে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় এবং চাষের মাছ উৎপাদনে পঞ্চম। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মাছ উৎপাদন হয়েছে ৫২ লাখ ৫৫ হাজার টন, যা বছরে প্রায় ৫০ লাখ টন অভ্যন্তরীণ চাহিদার চেয়ে বেশি। এখন উৎপাদনের এ সাফল্যকে রপ্তানি আয়ে রূপান্তর করাই বড় লক্ষ্য। এজন্য নতুন বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
সামুদ্রিক চাষ ও কাঁকড়ায় সম্ভাবনা : সামুদ্রিক চাষ সম্প্রসারণে সরকার খসড়া জাতীয় সামুদ্রিক চাষ নীতিমালা তৈরি করেছে। এতে বিনিয়োগ, উৎপাদন প্রযুক্তির উন্নয়ন ও সামুদ্রিক প্রতিবেশব্যবস্থা সংরক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নীতিমালাটি কার্যকর হলে সামুদ্রিক শৈবাল, জলজ প্রাণী এবং সমুদ্রভিত্তিক নতুন শিল্পের বিকাশের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কাঁকড়া উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়াতে তৈরি করা হয়েছে ‘টেকসই কাঁকড়া উৎপাদন, আহরণ, ব্যবস্থাপনা ও রপ্তানি নির্দেশিকা, ২০২৬’-এর খসড়া। এতে বিনিয়োগ আকর্ষণ, আহরণ-পরবর্তী ক্ষতি কমানো, শীতল সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন, মূল্য সংযোজিত পণ্য তৈরি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার প্রস্তুতি : দেশের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের (ইইজেড) বাইরে বাংলাদেশের পতাকাবাহী মাছ ধরার জাহাজের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে মৎস্য অধিদপ্তর ‘গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার নির্দেশিকা, ২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করেছে।
এতে জাহাজের লাইসেন্স, আহরণ করা মাছের তথ্য জমা, নজরদারি, পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ, নাবিকদের নিরাপত্তা এবং অবৈধ, অনিয়ন্ত্রিত ও অনিবন্ধিত মাছ ধরা প্রতিরোধের বিধান রাখা হয়েছে।
তবে এ কার্যক্রম সম্প্রসারণে আধুনিক মাছ ধরার জাহাজ, কার্যকর পর্যবেক্ষণব্যবস্থা, মাছের মজুত সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য এবং পর্যাপ্ত সংরক্ষণসুবিধা প্রয়োজন। বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা না বাড়লে গভীর সমুদ্রের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে।
সংরক্ষণ ও গবেষণায় ২০০ কোটি টাকা : সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কুয়াকাটা ও সালিমপুরে দুটি নতুন সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করেছে সরকার। এর ফলে দেশে ঘোষিত সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ও সামুদ্রিক মৎস্য সংরক্ষণ এলাকার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতটিতে।
এসব এলাকা মাছের মজুত পুনরুদ্ধার ও সামুদ্রিক আবাসস্থল রক্ষায় সহায়ক হতে পারে। তবে সুফল পেতে কার্যকর নজরদারি, বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ এবং উপকূলীয় জেলে সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে নীল অর্থনীতি বিষয়ে গবেষণা ও উন্নয়নে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে সরকার। এর মধ্যে ১০০ কোটি টাকা নির্দিষ্ট নীল অর্থনীতি গবেষণা তহবিলের জন্য। এ অর্থ সামুদ্রিক সম্পদের তথ্য সংগ্রহ, মাছের মজুত নিরূপণ এবং উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।
বাস্তবায়নই বড় পরীক্ষা : মৎস্য রপ্তানি ১০০ কোটি ডলারে উন্নীত করতে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণ, শীতল সরবরাহব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার সক্ষমতা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে সামুদ্রিক চাষ ও কাঁকড়া উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার অবকাঠামো উন্নয়নে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
এজন্য সরকারি সংস্থা, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের সমন্বয় এবং বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা দূর করা জরুরি। পাশাপাশি সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সব মিলিয়ে, ২০৩০ সালের মধ্যে মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্যের রপ্তানি আয় ১০০ কোটি ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য অর্জন নির্ভর করবে খসড়া নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, গবেষণা এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণের ওপর।
