বন্যার পানি নেমে গেলেও রয়ে গেছে ক্ষতচিহ্ন, উর্বর কৃষিজমিতে বালুর স্তর

রেজাউল করিম মানিক, লালমনিরহাট

লালমনিরহাটে বন্যার পানি নেমে গেছে দু’দিন আগেই। কিন্তু নদী তীরবর্তী বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে এখনো পড়ে আছে বালুর স্তর। কোথাও ছয়-সাত ইঞ্চি, কোথাও এক থেকে দুই ফুট পর্যন্ত বালু জমে উর্বর কৃষিজমি ঢেকে ফেলেছে। ফলে আমনসহ মৌসুমি ফসল আবাদ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন হাজারো কৃষক। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, দ্রুত বালু অপসারণ করা না গেলে এসব জমি বছরের পর বছর অনাবাদি পড়ে থাকতে পারে।

কৃষকরা বলছেন, বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই নতুন করে বালুর অভিশাপে পড়েছেন তারা। জমিতে বালুর স্তর জমে থাকায় চাষাবাদ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অথচ এক বিঘা জমি থেকে বালু সরাতে প্রয়োজন হচ্ছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা, যা অধিকাংশ কৃষকের পক্ষেই বহন করা সম্ভব নয়। এতে কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ!

বন্যার পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিয়েছে নতুন করে নদীভাঙনের আশঙ্কা। তিস্তার তীব্র স্রোতে নদীতীরের বিস্তীর্ণ এলাকা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার তিস্তা নদীতীরবর্তী কালমাটি গ্রামের কৃষক আব্দুল জব্বারের রয়েছে আট বিঘা আবাদি জমি। এবারের বন্যায় এর মধ্যে দুই বিঘা জমি পানিতে তলিয়ে যায়। পানি সরে গেলে তিনি দেখেন, ওই দুই বিঘা জমির ওপর প্রায় এক ফুট বালুর স্তর জমে রয়েছে।

হতাশ কণ্ঠে তিনি বলেন, জমির ওপর থেকে বালু না সরালে কোনো ফসলই ঠিকমতো হবে না। কিন্তু এত টাকা দিয়ে বালু সরানোর সামর্থ্য আমাদের নেই। হয়তো আবার বড় বন্যা হলে কিছু বালু সরে যাবে। নদীর পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বালু এসে জমিতে পড়ে থাকে। বালুময় জমিতে কোনো ফসল ভালো হয় না। এতে আমরা ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়ি।

একই গ্রামের কৃষক আনছার আলীর দশ বিঘা জমির মধ্যে এক বিঘা এখন বালুর নিচে চাপা পড়েছে। তিনি বলেন, ‘বড় ধরনের বন্যা হলে হয়তো কিছু বালু সরে যাবে। তা না হলে কয়েক বছর জমি অনাবাদি রাখতে হবে। এক বিঘা জমির বালু সরাতে কমপক্ষে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা লাগবে। এই টাকা কোথায় পাব?

কালীগঞ্জের ভোটমারী ইউনিয়নের শৈলমারী গ্রামের কৃষক রহমত আলী বলেন, পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বালু এসে জমিতে পড়ে আছে। আমার ৮ বিঘা জমি পানির নিচে ছিল। এর মধ্যে তিন বিঘা জমিতে এখন বালুর স্তর জমেছে। শুধু আমার নয়, প্রায় সব কৃষকের জমির একই অবস্থা।

একই এলাকার কৃষক ওসমান গনি বলেন, দুই বিঘা জমিতে বাদাম চাষ করেছি। পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়েছে। এই জমিতে এখন পলি পড়ে আছে।

হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী ইউনিয়নের কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, আমরা অনেক কষ্ট করে চাষাবাদ করি। কিছুদিন আগে একবার বন্যায় ডুবে গিয়ে আমার ৩ বিঘা জমির আমন ধান নষ্ট হয়েছিল। চারা ক্রয় করে দ্বিতীয় দফায় রোপণ করেছিলাম। সেটাও এক সপ্তাহের ব্যবধানে বন্যার পানিতে ডুবে নষ্ট হলো। এখন চারা কেনার টাকাও নেই। চারা রোপন না করলে পরিবার খাবে কি? আমরা কিভাবে বাঁচবো জানি না।

কৃষি কর্মকর্তা বলছেন, সাধারণ বন্যায় নদীর পানির সঙ্গে উর্বর পলি জমে ভেসে আসে, যা জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। কিন্তু নদীর তীররক্ষা বাঁধ ভেঙে বা প্রবল স্রোতে পানি প্রবেশ করলে সেখানে পলির চেয়ে মোটা বালুর পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। ফলে উর্বর মাটির ওপর বালুর স্তর জমে কৃষিজমি দীর্ঘ সময়ের জন্য অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ড. সাইখুল আরিফিন জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি হচ্ছে। তিনি কৃষকদের উঁচু জমিতে রাখা আমনের ক্ষেত থেকে চারা তুলে পুনরায় রোপণের পরামর্শ দিয়েছেন।

রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর রংপুর অঞ্চলের কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্রসহ বিভিন্ন নদ-নদীর তীরবর্তী এলাকার বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে বালুর স্তর জমে।

তিনি আরও বলেন, পরবর্তী বন্যায় কিছু জমি থেকে বালু স্বাভাবিকভাবেই সরে যায়। তবে অনেক জমিতে বছরের পর বছর বালু রয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া যায়।

কৃষকদের দাবি, শুধু ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করলেই হবে না। দ্রুত বালু অপসারণে সরকারি সহায়তা, পুনর্বাসন কর্মসূচি এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা না দিলে নদীতীরবর্তী এলাকার হাজারো পরিবার দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে এমনটাই জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights