মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ: ভারত থেকে উধাও ৩১ লাখ কোটি রুপি

অনলাইন ডেস্ক
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে যৌথভাবে হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তৎক্ষণাৎ পাল্টা হামলা শুরু করে ইরানও। ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে তেহরান। এতে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে গোটা মধ্যপ্রাচ্য।

ক্রমবর্ধমান এই সংঘাতের প্রভাবে ভারতীয় শেয়ারবাজারে বিক্রিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি এই সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে বিনিয়োগকারীদের সম্পদমূল্য থেকে প্রায় ৩১ লাখ কোটি রুপি মুছে গেছে। অপরিশোধিত তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়া, বিদেশি তহবিল প্রত্যাহার এবং ভারতের মতো বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশের জন্য বড় অর্থনৈতিক ধাক্কার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা চাপে পড়েছেন। ফলে ভারতের প্রধান শেয়ার সূচকগুলো ধারাবাহিকভাবে নেমে গেছে। শুধু সোমবারই বাজার মূলধন থেকে প্রায় ১২.৭৮ ট্রিলিয়ন বা প্রায় ১৩ লাখ কোটি রুপি হারিয়ে গেছে।

এই প্রতিবেদন লেখার সময় বিএসই সেনসেক্স ছিল ৭৬,৬১৯.২৫ পয়েন্টে, যা আগের সেশনের ৭৮,৯১৮.৯০ পয়েন্ট থেকে ২,২৯৯.৬৫ পয়েন্ট বা ২.৯১ শতাংশ কম। এনএসই নিফটি ৫০ ছিল ২৩,৭৩৬.২৫ পয়েন্টে, যা ২৪,৪৫০.৪৫ পয়েন্ট থেকে ৭১৪.২০ পয়েন্ট বা ২.৯২ শতাংশ নিচে। গত এক বছরের মধ্যে দলাল স্ট্রিটে এটি সবচেয়ে বড় অস্থিরতার ঘটনাগুলোর একটি। বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা শুরুর পর থেকে তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির সম্মিলিত বাজার মূলধন দ্রুত কমে গেছে।

বাজারের এই অস্থিরতা ঘটেছে অপরিশোধিত তেলের দামে বড় উল্লম্ফনের সঙ্গে সঙ্গে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক সপ্তাহে ২৫ শতাংশের বেশি বেড়ে সাময়িকভাবে প্রতি ব্যারেল ১১৪ ডলার ছাড়িয়েছে। কারণ, এই সংঘাত বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত করছে। ভারতের জন্য তেলের বাড়তি দাম বিশেষভাবে ক্ষতিকর। কারণ দেশটি তার মোট তেলচাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশ আমদানি করে। এতে মূল্যস্ফীতি, চলতি হিসাবের ঘাটতি এবং সরকারি আর্থিক চাপ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।

বিশ্ববাজারে ঝুঁকি এড়িয়ে চলার প্রবণতার মধ্যে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরাও বিক্রি বাড়িয়েছেন। গত চারটি লেনদেন সেশনে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় শেয়ারবাজার থেকে প্রায় ২১ হাজার কোটি রুপি তুলে নিয়েছেন। এর ফলে ফেব্রুয়ারিতে আসা ২২,৬১৫ কোটি রুপির প্রবাহের একটি বড় অংশ উল্টে গেছে। উল্লেখ্য, ফেব্রুয়ারির এই প্রবাহ ছিল ১৭ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।

বড় কোম্পানির শেয়ারবাজারকে টেনে নামাচ্ছে। প্রায় সব খাতেই বিক্রির চাপ দেখা গেছে। বড় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে রয়েছে এইচডিএফসি ব্যাংকের শেয়ার ৩ শতাংশের বেশি কমেছে। আইসিআইসিআই ব্যাংক প্রায় ৪.৫ শতাংশ নেমেছে। স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার শেয়ার ৫ শতাংশের বেশি পড়েছে। লারসেন অ্যান্ড টুবরোর শেয়ার প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে। তেল বিপণনকারী কোম্পানি বিপিসিএল, এইচপিসিএল এবং ইন্ডিয়ান অয়েলের শেয়ার ৮ শতাংশের বেশি নেমে গেছে। কারণ, তেলের দাম বাড়লে জ্বালানির বিক্রয়মূল্য সমান হারে না বাড়ানো হলে তাদের মুনাফার মার্জিনে চাপ পড়ে। বিমান পরিবহন খাতের শেয়ারও আঘাত পেয়েছে। ইন্টারগ্লোব অ্যাভিয়েশনের শেয়ার ৭ শতাংশের বেশি কমেছে। এর কারণ জেট ফুয়েলের দাম বাড়লে লাভ কমে যেতে পারে এমন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বাজারের বিস্তৃত অংশে আরও বড় ক্ষতি হয়েছে। বিএসই মিডক্যাপ সূচক প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে, আর বিএসই স্মলক্যাপ সূচক ৩ শতাংশেরও বেশি নেমে গেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, পুরো বাজারজুড়েই ঝুঁকি এড়িয়ে চলার প্রবণতা বেড়েছে। বিস্তৃত বাজারপতনের মধ্যেও প্রতিরক্ষা খাতের শেয়ার উল্টো প্রায় ৬ শতাংশ বেড়েছে। বিনিয়োগকারীরা ধারণা করছেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লে সামরিক ব্যয়ও বাড়তে পারে। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং অপরিশোধিত তেলের দাম কোন দিকে যায়, তা দেখেই বিনিয়োগকারীরা সিদ্ধান্ত নেবেন। তাই সামনের দিনগুলোতেও বাজারে অস্থিরতা বেশি থাকতে পারে।

বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, যদি তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের ওপরে থাকে, তাহলে তা ভারতের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর ব্যাপক চাপ ফেলতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি, রুপির বিনিময়মূল্য এবং সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সূত্র: এনডিটিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights