দাদা-দাদির কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত বৃষ্টি

মাদারীপুর প্রতিনিধি

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টিকে (২৬) নিজ গ্রামের মাটিতে দাফন করা হয়েছে। আজ শনিবার বিকেলে মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চর গোবিন্দপুর গ্রামে দাদা-দাদির কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। এর আগে গোবিন্দপুর উত্তর কান্দি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।

শনিবার সকাল থেকেই বৃষ্টির গ্রামের বাড়িতে নেমে আসে শোকের ছায়া। শেষবারের মতো তাকে এক নজর দেখতে ভিড় করেন আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও এলাকাবাসী। একই সঙ্গে চলতে থাকে কবর খোঁড়ার কাজ। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

সকাল ৯টা ১০ মিনিটে এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে দুবাই হয়ে নাহিদা সুলতানার মরদেহ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। বিমানবন্দর থেকে মরদেহ গ্রহণ করেন তার মা-বাবা ও স্বজনরা। পরে দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে মরদেহবাহী ফ্রিজিং গাড়ি গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। কান্নায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা।

জানাজায় উপস্থিত ছিলেন মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াদিয়া শাবাব, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। দাফন শেষে বৃষ্টির রুহের মাগফেরাত কামনায় বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।

মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, ‘বৃষ্টির নিহত হওয়ার ঘটনায় আমরা সার্বিক খোঁজখবর রাখছি। এই নৃশংস ঘটনার সঙ্গে জড়িত দোষী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি।’

মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মর্জিনা আক্তার বলেন, ‘বৃষ্টির পরিবারের পাশে আমরা সবসময় রয়েছি। ন্যায়বিচার প্রাপ্তির জন্য পরিবারটিকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।’

নিহত বৃষ্টির চাচি জাকিয়া সুলতানা বলেন, ‘বৃষ্টি ছিল আমাদের এলাকার একটি শিক্ষার আলো। ওর মতো মেধাবী মেয়ে আমরা আর পাব না। যারা ওকে হত্যা করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

চাচা দানিয়াল আকন বলেন, ‘বাড়িতে এলেই সবাইকে পড়াশোনার উপদেশ দিত। আজ সেই মেয়েটা লাশ হয়ে ফিরেছে, এটা মানতে পারছি না।’

চাচাতো ভাই রুমান আকন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আপুর কাছ থেকেই অনুপ্রেরণা পেয়েছি। ভাবিনি এভাবে ফিরে আসবে।’

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার নাহার একাডেমি হাইস্কুল থেকে এসএসসি ও শহীদ বীর উত্তম লে. আনোয়ার গার্লস কলেজ থেকে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করেন বৃষ্টি। পরে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) স্নাতকোত্তরে ভর্তি হন।

স্নাতকোত্তর শেষ হওয়ার আগেই ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় পূর্ণ বৃত্তিতে পিএইচডির সুযোগ পান তিনি। ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে যান বৃষ্টি।

গত ১৭ এপ্রিল বৃষ্টি ও আরেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন নিখোঁজ হন। পরে তাদের হত্যার ঘটনা সামনে আসে। এ ঘটনায় লিমনের রুমমেট ও ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার সাবেক শিক্ষার্থী হিশাম আবুঘরবেহকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

এদিকে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা কর্তৃপক্ষ নিহত বৃষ্টি ও লিমনকে মরণোত্তর ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights