৩৬ বছরের রেকর্ড ভেঙে দিলেন সিমোন

অনলাইন ডেস্ক

স্পেন তখন ২-০ গোলে এগিয়ে। স্পেনের জন্য জয়টা সময়ের ব্যাপার মনে হলেও বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের এক মাহেন্দ্রক্ষণ তখন কড়া নাড়ছিল ডিলান স্টেডিয়ামে। গোলপোস্টের সামনে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে উনাই সিমোন। সেই মুহূর্তে তাঁর মনে কি ভেসে উঠছিল ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের কান্নাভেজা শেষ মুহূর্তগুলোর কথা? যখন মরক্কোর কাছে টাইব্রেকারে হেরে বুকভাঙা হতাশায় বিদায় নিয়েছিল স্পেন!

সিমোন ও তার দল স্পেন ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে চার ম্যাচে মাত্র তিনটি গোল হজম করেছিল, তবু ভাগ্যবিপর্যয়ের শিকার হয়ে টুর্নামেন্ট থেকে তাদের দ্রুতই বিদায় নিতে হয়। সিমোনের গোল না খাওয়ার এই ধারা শুরু হয় জাপানের কাছে স্পেনের ২-১ ব্যবধানে হারের পর থেকে। সেই বিশ্বকাপে শেষ ১৫৯ মিনিট স্পেনের জালে কোনো বল জড়াতে দেননি সিমোন। কিন্তু দল বিদায় নেওয়ায় তাঁর কীর্তি ঢাকা পড়ে যায় বিষাদের কালো চাদরে।

কে জানত, চার বছর পর ২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চেও দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হবেন সিমোন! চলতি বিশ্বকাপে স্পেনের গ্রুপ পর্ব ছিল এককথায় নিখুঁত। কেপ ভার্দে, সৌদি আরব, লাতিন পরাশক্তি উরুগুয়ে কোনো দলই ভাঙতে পারেনি সিমোন-দেয়াল।

গতকাল অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানের জয়ে কোনো গোল না হজম করে তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে ৩৬ বছরের পুরোনো রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন। এটি এই বিশ্বকাপে সিমোনের টানা চতুর্থ ক্লিন শিট। গ্রুপ পর্বে কেপ ভার্দে (ম্যাচটি ০-০ ), সৌদি আরব (স্পেন ৪-০ গোলে জয়ী) এবং উরুগুয়ে (স্পেন ১-০ গোলে জয়ী)—সব ম্যাচেই সিমোন অপরাজিত। টানা তিন ম্যাচে ক্লিন শিট রেখে স্পেন যখন নকআউটে পা রাখল, তখন সিমোনের নামের পাশে যোগ হয়েছিল আরও ২৭০ মিনিট। মোট ৪২৯ মিনিট!

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুর দিকে সিমোন ২০১০ ও ২০১৪ বিশ্বকাপজুড়ে ইকার ক্যাসিয়াসের গড়া ৪৭৬ মিনিটের স্প্যানিশ রেকর্ডটি ছাড়িয়ে যান। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধে এল কাঙ্ক্ষিত ক্ষণ। ১৯৯০ বিশ্বকাপে ইতালির কিংবদন্তি গোলরক্ষক ওয়াল্টার জেঙ্গা টানা ৫১৭ মিনিট গোল না খাওয়ার যে রেকর্ড গড়েছিলেন, তা ভেঙে দেন সিমোন। বড় পর্দায় ভেসে ওঠে, ‘বিশ্বকাপ রেকর্ড ভেঙে গেল!’

আকাশের দিকে তাকিয়ে সিমোন যেন সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ দিলেন, তবে সঙ্গে সঙ্গেই গ্লাভস দুটি চাপড়ে সতীর্থ ডিফেন্ডারদের পজিশন ঠিক রাখার তাগিদ দিলেন। ৩-০ গোলের সহজ জয়ে স্পেন গেল শেষ ১৬-এ। এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সিমোনকে মাত্র চারটি সেভ করতে হয়েছে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দুর্ধর্ষ কোনো সেভই করতে হয়নি তাঁকে।

গ্যালারির গর্জন ছাপিয়ে ম্যাচ শেষে ধারাভাষ্যকারের কণ্ঠে আবেগ, ‘রেকর্ড ভাঙার জন্যই তৈরি হয়, কিন্তু উনাই (সিমোন) আজ যা করেছে, তা স্রেফ রেকর্ড নয়। এটি একাগ্রতা, আত্মত্যাগ আর ধৈর্যের এক পরম পরীক্ষা।’ স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্ত আবেগাপ্লুত, ‘আমি তার জন্য গর্বিত। আমার মনে হয় সে আমার পরিবারেরই একজন সদস্য। সে জয়ে খুব বড় ভূমিকা পালন করেছে। তবে এটি শুধু ব্যক্তিগত নৈপুণ্য নয়, এটি সেই রক্ষণাত্মক প্রচেষ্টার জন্য পুরো দলের একসঙ্গে একতাবদ্ধ হওয়া।’

প্রায় অর্ধদশক ধরে স্পেনের গোলরক্ষক হিসেবে উনাই সিমনই প্রথম পছন্দ। ইউরোপের চারটি বড় লিগের দুটিতে শিরোপাজয়ী দুই গোলরক্ষক ডেভিড রায়া ও জোয়ান গার্সিয়ার মতো দলের অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে কড়া টক্কর দিয়ে জায়গা ধরে রেখেছেন ২৯ বছর সিমোন। সিমন তার ক্লাব ক্যারিয়ারের প্রায় পুরোটা সময় অ্যাথলেটিকো বিলবাও-এ কাটিয়েছেন। তাঁর ক্যারিয়ারে গত মৌসুমে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে বিলবাও।

২০১৫ থেকে দে লা ফুয়েন্তের কোচিং দীক্ষা পেয়েছেন সিমোন। ১৮ বছর বয়সী লড়াকু গোলরক্ষক গ্রিসে ইউরোপীয় অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছিলেন। তারা স্পেনের যুব দলেও একসঙ্গে লড়েছেন। ২০২২ সালে জাতীয় দলের ডাগআউটে আসেন ফুয়েন্তে। সিমোনকে অতন্দ্র প্রহরী রেখে ২০২৩ সালের নেশনস লিগ এবং ২০২৪ সালের ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপের রাজমুকুট জিতেছে, আর এখন তারা দীর্ঘ ১৬ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ জিতেছে। সেই জয়ের অন্যতম নায়ক অবশ্যই উনাই সিমোন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights