জাপানে রেকর্ড বৃষ্টিতে বন্যা: চারজনের মৃত্যু, নারিতা বিমানবন্দরে আটকা হাজারো যাত্রী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

জাপানের টোকিও-সংলগ্ন চিবা প্রিফেকচারে নজিরবিহীন ও রেকর্ড পরিমাণ ভারী বর্ষণের ফলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি ও চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। শুক্রবার পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে অন্তত চারজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আরও একজন নিখোঁজ রয়েছেন।

ভয়াবহ এই বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে স্থানীয় পরিবহনব্যবস্থা পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে এবং হাজার হাজার ঘরবাড়ি বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। জাপানের অন্যতম প্রধান ছুটির মৌসুমে এই প্রবল বর্ষণের ফলে টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটকা পড়েছেন প্রায় সাত হাজার যাত্রী। সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় ও ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধারে ইতিমধ্যে সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে দেশটির সরকার।

রাজধানী টোকিওর পার্শ্ববর্তী চিবা প্রিফেকচারের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে গত চব্বিশ ঘণ্টায় ৩৬০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। টানা ভারী বর্ষণে মুহূর্তের মধ্যে রাস্তাঘাট ও রেলপথ তলিয়ে যায়। বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়া একটি গাড়ির ভেতরে আটকে পড়ে একজনের মৃত্যু হয় বলে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে শুক্রবার সকালে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে চিবুর গভর্নর তোশিহিতো কুমাগাই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও নজিরবিহীন একটি পরিস্থিতি। তিনি অতীতে বহু দুর্যোগ মোকাবিলা করেছেন, কিন্তু নিজের অভিজ্ঞতায় এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি কখনো হননি বলে জানান।

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে অঞ্চলজুড়ে নাগরিক পরিষেবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার জানায়, শুক্রবার সকাল ১১টা পর্যন্ত ওই এলাকার ২২ হাজারের বেশি পরিবার সম্পূর্ণ বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল। চিবু শহরের সার্বিক পরিস্থিতি সবচেয়ে আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। সেখানে সরকারি ভবনগুলোকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং শত শত দুর্গত মানুষ ফয়েল ব্ল্যাঙ্কেট মুড়ি দিয়ে রাত কাটাতে বাধ্য হয়েছেন।

প্রবল বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় সড়ক ও রেল যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় নারিতা বিমানবন্দরে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের এক মুখপাত্র জানান, পরিবহনব্যবস্থা বন্ধ থাকায় প্রায় সাত হাজার বিমানযাত্রী টার্মিনালেই আটকা পড়েছেন। তবে দূর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেও শুক্রবারের নির্ধারিত সব ফ্লাইট স্বাভাবিকভাবেই পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেশটির জাতীয় বিমান সংস্থা ‘জাপান এয়ারলাইন্স’ জানিয়েছে, দুর্যোগের কারণে কিছু ফ্লাইট বিলম্বিত হতে পারে, তবে এই মুহূর্তে কোনো ফ্লাইট বাতিলের পরিকল্পনা তাদের নেই।

হাইওয়ে পরিচালনাকারী সংস্থা ‌‌‘নেক্সকো ইস্ট’ জানিয়েছে, চিবাকে সংযোগকারী বেশ কয়েকটি প্রধান মহাসড়ক বন্ধ করে দেওয়ায় বিকল্প রাস্তায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি বেশ কয়েকটি ট্রেন পরিষেবা শুক্রবার সকাল পর্যন্ত স্থগিত রাখতে হয়েছিল। তবে নারিতা বিমানবন্দরকে টোকিও শহরের সঙ্গে যুক্তকারী কয়েকটি বিশেষ ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু হওয়ায় বিমানবন্দর এলাকার উপচে পড়া ভিড় কিছুটা কমতে শুরু করেছে।

জাপানের জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকে-তে প্রচারিত ফুটেজে দেখা যায়, গত রাতে বিমানবন্দরে আটকে পড়া শত শত যাত্রী কম্বল, পানির বোতল ও হালকা খাবার সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। পরে টার্মিনাল ভবনের মেঝেতেই তারা রাত কাটানোর ব্যবস্থা করেন।

পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নারিতা বিমানবন্দরে আটকে পড়া এক মার্কিন পর্যটক এনএইচকে-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের কষ্টের কথা তুলে ধরে বলেন, জীবনের এই ভয়াবহ ও চরম দুর্ভোগের ভ্রমণের কথা তারা কখনো ভুলতে পারবেন না।

সূত্র: রয়টার্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights