শত শত মানুষের পরিণতি অজানা: হিমবাহ ধসে মাটির সঙ্গে মিশে গেল চীন-নেপাল সীমান্তের জিরোং পোর্ট

অনলাইন ডেস্ক

হিমবাহ ধসের পর ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে চীন-নেপাল সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ জিরোং পোর্ট। একসময় যেখানে প্রতিদিন শত শত পর্যটক ও ব্যবসায়ী যাতায়াত করতেন, এখন সেখানে পড়ে আছে শুধু পাথর, কাদা, নুড়ি আর ধ্বংসস্তূপ। সীমান্তকেন্দ্রের পাঁচতলা ভবন, বিভিন্ন স্থাপনা, দোকানপাট এবং দুই দেশকে সংযোগকারী সেতুটিও ধসে পড়েছে।

গত ২৬ আগস্ট হিমবাহ ধস থেকে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় তিব্বতের জিরোং পোর্টে এই বিপর্যয় ঘটে। পরে ওই দুর্যোগের প্রভাব নেপালের সীমান্ত এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে।

সম্প্রতি চীনা কর্তৃপক্ষের আয়োজিত সফরের অংশ হিসেবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সিএনএনের একটি প্রতিনিধি দল। সেখানে এখনও মাটি স্থিতিশীল নয় এবং নতুন করে ভূমিধসের ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে সাংবাদিকদের হেলমেট ও বুট পরে দুর্গম এলাকায় প্রবেশ করতে হয়েছে।

দুর্ঘটনার আগে জিরোং পোর্ট ছিল চীন ও নেপালের মধ্যে পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াতপথ। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভয়াবহ জলস্রোত ও কাদার স্রোতে পুরো এলাকা তছনছ হয়ে যায়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, আকস্মিক স্রোত ধেয়ে আসার পর জীবন বাঁচাতে মানুষ ছুটছেন। পরে বন্যার পানির সঙ্গে আসা কাদা ও পাথরের নিচে চাপা পড়ে যায় বিস্তীর্ণ এলাকা।

এখন সেখানে পাঁচতলা সীমান্ত ভবনটির শুধু ভিত্তির কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে। ভবনটির পাশাপাশি ট্রাভেল এজেন্সি, দোকানপাট এবং চীন-নেপাল সংযোগকারী সেতুটিও পানির তোড়ে ভেসে গেছে।

উদ্ধারকর্মী ঝাং শিয়াওজুন সিএনএনকে বলেন, ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শুরু করার পর তারা ভবনের শুধু ভিত্তিটুকুই দেখতে পেয়েছেন।

নিহতদের স্মরণে দুর্ঘটনাস্থলে একটি অস্থায়ী স্মৃতিসৌধও তৈরি করা হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের ওপর রাখা হয়েছে প্রায় ১০০টি হলুদ ফুল। সেখানে উড়ছে চীনের জাতীয় পতাকা।

কঠিন পরিস্থিতিতে উদ্ধার অভিযান

দুর্ঘটনাস্থলে উদ্ধারকাজ চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। চারদিকে জমে আছে কাদা, পাথর ও বিভিন্ন ধরনের ধ্বংসাবশেষ। এর সঙ্গে রয়েছে নতুন ভূমিধসের আশঙ্কা। পাহাড়ি এলাকার ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতিও এখনও স্থিতিশীল নয়।

২৮ আগস্ট থেকে ওই এলাকায় কাজ করছেন উদ্ধারকারী দলের প্রধান ইয়াং কিচিয়াও। তিনি বলেন, উদ্ধার অভিযানের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ঘটনাস্থলের প্রতিকূল পরিস্থিতি। কাদা ও পলির পাশাপাশি সেখানে বড় বড় পাথর পড়ে আছে। যেকোনো সময় নতুন করে ভূমিধসের মতো বিপদ তৈরি হতে পারে।

চীনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তের চীনা অংশে এখন পর্যন্ত ৪৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৫১৯ জন। তিব্বতের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিখোঁজদের মধ্যে ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক।

তবে দুর্ঘটনার সময় জিরোং পোর্টে ঠিক কতজন মানুষ ছিলেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও প্রকাশ করা হয়নি। নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে থাকা পরিবারগুলোর মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নিখোঁজদের পূর্ণ তালিকা প্রকাশ না করায় স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

তবে বেইজিং বলছে, দুর্গম এলাকা থেকে পাওয়া তথ্য যত দ্রুত সম্ভব প্রকাশ করা হচ্ছে।

এদিকে চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নেপালের সীমান্তবর্তী ১ হাজার ৭২০ জন বাসিন্দাকে তারা ত্রাণ সহায়তা দিয়েছে। উদ্ধার অভিযানে আড়াই হাজারের বেশি কর্মী এবং ৫০০টির বেশি যান মোতায়েন করা হয়েছে। নিখোঁজদের সন্ধান ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছাতে ড্রোন এক হাজারের বেশি ফ্লাইট পরিচালনা করেছে।

দুর্গম পথ পেরিয়ে ঘটনাস্থলে উদ্ধারকর্মীরা

জিরোং পোর্টে পৌঁছানোই উদ্ধারকর্মীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তিব্বতের রাজধানী লাসা থেকে দুর্গত এলাকায় যেতে দীর্ঘ সময় পাহাড়ি সড়ক পাড়ি দিতে হয়। পথের অনেক অংশ বন্যা ও ভূমিধসে ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে সেখানে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছিল না।

দুর্যোগের প্রায় এক সপ্তাহ পর সড়কটি চলাচলের উপযোগী করা হয়। এরপর হাজার হাজার উদ্ধারকর্মী ও ভারী যন্ত্রপাতি দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে শুরু করে। তার আগে অনেক উদ্ধারকারীকে পায়ে হেঁটে দুর্গত এলাকায় যেতে হয়েছে।

উদ্ধারকারী দলের প্রধান ইয়াং কিচিয়াও জানান, সড়ক ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় শুরুতে পায়ে হেঁটেই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছাতে হয়েছে। পাহাড়ি পথ পেরিয়ে দুর্গম এলাকায় গিয়ে উদ্ধারকাজ চালাতে হয়েছে তাদের।

এখন ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলছে স্তরে স্তরে। উদ্ধারকর্মীরা প্রথমে একটি স্তরের কাদা ও ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে সেখানে তল্লাশি করছেন। সেটি পরিষ্কার করার পর পরবর্তী স্তরে যাচ্ছেন।

উদ্ধারকর্মী ঝাং শিয়াওজুন বলেন, তারা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছেন এবং নিখোঁজদের সন্ধানে প্রতিটি স্তর ভালোভাবে পরীক্ষা করছেন।

নতুন বিপদের আশঙ্কা

উদ্ধার অভিযান চলার মধ্যেও নতুন করে ভূমিধস ও প্রাকৃতিক বাঁধ ধসে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাহাড়ি নদীতে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ কাদা ও ধ্বংসাবশেষের কারণে কোথাও কোথাও অস্থায়ী জলাধার বা ‘ব্যারিয়ার লেক’ তৈরি হয়েছে। এসব জলাধার ভেঙে গেলে নতুন করে বন্যা দেখা দিতে পারে।

এর সঙ্গে রয়েছে ভারী বৃষ্টিপাত ও দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ডের সমস্যা। ফলে উদ্ধার অভিযান বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

কর্তৃপক্ষ নেপালের লাংটাং লিরুং পর্বতের হিমবাহসংলগ্ন এলাকাতেও সতর্কতা জারি করেছে। ওই এলাকার হিমবাহের একটি অংশ ধসে পড়ার পরই ২৬ আগস্টের ভয়াবহ ভূমিধস ও বন্যার সূত্রপাত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

এই বিপর্যয় চীন ও নেপালের মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের তথ্য আদান-প্রদান, ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও জোরদারের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।

তবে আপাতত সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার উদ্ধার অভিযান। ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে অপেক্ষা করছেন শত শত পরিবার। তাদের কাছে এখন একটাই প্রশ্ন—২৬ আগস্টের সেই ভয়াবহ সময়ে জিরোং পোর্টে থাকা প্রিয়জনদের শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল।

সূত্র: প্রেসরুম, সিএনএন প্রেসরুম, সানা, টিবিএস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights