গরম সমুদ্রে কমছে মাছ

শামীম আহমেদ
জলবায়ু পরিবর্তনে ক্রমেই উষ্ণ হচ্ছে সমুদ্র। ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের স্বাভাবিক জীবনচক্র। উষ্ণতা বৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মাছের প্রজনন, কমছে মাছসহ জলজ প্রাণীর খাদ্যের প্রাথমিক উৎস। মাছ স্থান পরিবর্তন করছে। এতে আগামীতে সারা বিশ্বের সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে- এমন তথ্য উঠে এসেছে সাম্প্রতিক গবেষণায়। ইতোমধ্যে গত তিন বছরের ব্যবধানে বঙ্গোপসাগর থেকে মৎস্য আহরণ কমেছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৭১৮ মেট্রিক টন। এতে হুমকিতে পড়েছে সামুদ্রিক মৎস্য খাতটি। মাছ ধরতে যেতে হচ্ছে গভীর সমুদ্রে। দীর্ঘ সময় সাগরে থেকেও সন্তোষজনক মাছ না পাওয়ায় লোকসান গুনে পেশা পরিবর্তন করছেন অনেকে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সমুদ্রে মাছ কমে যাওয়ায় এই খাতে বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে দেশের আমিষের চাহিদা পূরণেও বড় ধাক্কা আসতে পারে।

এদিকে গত ৭০ বছরের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনোর কবলে এখন বিশ্ব। এর প্রভাবে প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির তাপমাত্রা ইতোমধ্যে স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়েছে। এটা ৪ ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা। এই পরিস্থিতি সামুদ্রিক মৎস্য খাতকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। চলতি মাসে ন্যাচার কমিউনিকেশনস- এ প্রকাশিত ‘‘মৎস্যসম্পদের ব্যাপক হ্রাসের সঙ্গে জটিল ও চরম জলবায়ু ঘটনার যোগসূত্র’’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও সমুদ্রের পানির তাপমাত্রার সঙ্গে মাছের উৎপাদনশীলতা হ্রাস-বৃদ্ধির যোগসূত্র পাওয়া গেছে। উইলিয়াম ডব্লিউ এল চিউং, টমাস এল ফ্রলিশার, ইসাবেলা মরগান্তেসহ গবেষকরা ১২৪৬ প্রজাতির মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী এবং ২৫৪টি অঞ্চলের প্রায় তিন দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। এতে ৬ হাজার ৬৫৯টি মৎস্য ও পরিবেশগত সময়সারি ব্যবহার করা হয়েছে।

তাতে দেখা গেছে, সমুদ্র যত উষ্ণ হচ্ছে, মাছ ধরার ঝুঁকিও তত বাড়ছে। শুধু সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়াই নয়, একই সময়ে যদি মাছের খাদ্য তৈরির ভিত্তি কমে যায়- তাহলে মাছের আহরণে বড় ধরনের ধস নামতে পারে। গবেষণায় বলা হয়, সমুদ্রের পানি পরপর দুই বছর অস্বাভাবিক উষ্ণ থাকলে অতি কম মাছ আহরণের আশঙ্কা স্বাভাবিক বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বাড়ে। যখন অতিরিক্ত উষ্ণতার সঙ্গে সমুদ্রের প্রাথমিক উৎপাদনশীলতাও অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়, তখন অতি কম মৎস্য আহরণের আশঙ্কা ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এখানে ‘অতি কম আহরণ’ বলতে গবেষকরা সংশ্লিষ্ট সময়সারির সবচেয়ে নিচের ১০ শতাংশ আহরণের ঘটনাকে বুঝিয়েছেন। এর অর্থ হলো-এ ধরনের চরম পরিবেশে অস্বাভাবিক কম মাছ ধরার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

গরম সমুদ্রে সমস্যা কোথায়: সমুদ্রের তাপমাত্রা মাছের শরীরের বৃদ্ধি, প্রজনন ও বেঁচে থাকার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে উষ্ণ সমুদ্রে পানির স্তরবিন্যাস বাড়তে পারে। এতে গভীর স্তর থেকে ওপরের স্তরে পুষ্টি উপাদান ওঠার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। এতে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের উৎপাদন কমে যায়। ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন কমলে ধাপে ধাপে খাদ্যশৃঙ্খলের ওপরের স্তরের প্রাণীদের খাদ্যপ্রাপ্তিও কমে যায়। এতে ওপরের স্তরের মাছের উৎপাদনশীলতা যেমন কমে, আবার মাছ স্থান পরিবর্তন করে অন্য এলাকায় চলে যায়। পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও প্রাথমিক খাদ্য উৎপাদন একসঙ্গে কমলে ওই এলাকায় মৎস্য আহরণ ৮০ ভাগ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। গবেষণায় উষ্ণমণ্ডলীয় ও উপ-উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে এ ধরনের ঝুঁকি বেশি দেখা গেছে।

বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা: বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সামুদ্রিক জলসীমা রয়েছে। সরকারের হিসাবে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে যুক্ত রয়েছে ২৯ হাজারের বেশি বাণিজ্যিক ও ছোট যান্ত্রিক নৌযান। তবে জেলেদের সংখ্যার ভিত্তিতে নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত মিলিয়ে প্রায় ৬৫ হাজার নৌযান বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরায় নিয়োজিত বলে মনে করা হয়। এই খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় নয় লাখ মানুষ জড়িত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বঙ্গোপসাগরে মৎস্য আহরণে বড় ধরনের ভাটা পড়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশে সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন ছিল ৭ লাখ ৬ হাজার ৩০ মেট্রিক টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৭৯ হাজার ৩৮৫ মেট্রিক টনে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আরও কমে হয় ৬ লাখ ২৮ হাজার ৬২৩ মেট্রিক টন। সবশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেমে আসে ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৩১২ মেট্রিক টনে। আর সমুদ্রের পরিবেশ বদলে গেলে ঝুঁকিটি শুধু মাছের নয়, সরাসরি জেলে পরিবারের আয় ও জীবিকার সঙ্গেও যুক্ত।

চট্টগ্রামের ফিসিং বোট এফভি রূপচান্দার কর্মকর্তা শাহীন আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, গত কয়েক বছর ধরেই সাগরে আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। এখন সাগরের অনেক গভীরে যেতে হয়। বেশি দিন থাকতে হয়। এতে জ্বালানিসহ অন্যান্য ব্যয় বাড়ে। কিন্তু সেই অনুযায়ী মাছ মেলে না। লোকসানের কারণে অনেক নৌযান বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো চলছে, তারা নিয়মিত বেতন দিতে পারে না। বাধ্য হয়ে অনেকে চাকরি ছেড়ে দিচ্ছে।

গবেষকরা ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিও বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁদের মডেল অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অস্বাভাবিক কম আহরণের ঘটনা আরও বেশি এলাকায় দেখা দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই বঙ্গোপসাগরে শুধু মোট কত টন মাছ ধরা হচ্ছে, সেটি জানাই যথেষ্ট নয়। কোন প্রজাতি কমছে, সমুদ্রের কোন এলাকায় মাছের বিচরণ বদলাচ্ছে, পানির তাপমাত্রা ও উৎপাদনশীলতার সঙ্গে আহরণের সম্পর্ক কী-এসব তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ প্রয়োজন বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights