ভারতের ‘উগ্রপন্থী’দের স্টারলিংকের ইন্টারনেট ব্যবহারের দাবি নাকচ করলেন ইলন মাস্ক

অনলাইন ডেস্ক

স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইলন মাস্ক বলেছেন, ভারতে স্টারলিংকের স্যাটেলাইট বিম বন্ধ রয়েছে। তাই দেশটিতে ‘উগ্রপন্থীরা’ স্টারলিংকের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবহার করেছে-এমন দাবি সঠিক নয়।
বুধবার এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এ কথা বলেন মাস্ক।

স্টারলিংক স্পেসএক্সের একটি টেলিযোগাযোগ সেবা। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট দেয় প্রতিষ্ঠানটি। ভারতীয় সংবাদসংস্থা এএনআই নিউজ জানায়, এক্সে ডজডিজাইনার নামের একটি অ্যাকাউন্টের পোস্টের জবাবে মাস্ক বলেন, ‘ভারতের ওপর স্টারলিংকের স্যাটেলাইট বিম বন্ধ রয়েছে। তাই যেকোনো ব্যক্তি, যেকোনো কারণে এটি ব্যবহার করেছে- এমন দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা।’

ডজডিজাইনারের ওই পোস্টে দাবি করা হয়েছিল, মিয়ানমার সীমান্তের কাছে ভারতের মণিপুরে সক্রিয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে নিরাপত্তা বাহিনী স্টারলিংকের টার্মিনাল উদ্ধার করেছে। ডজডিজাইনার বলেছে, ভারতে উগ্রপন্থীরা স্টারলিংক ব্যবহার করেছে-এমন দাবি যুক্তিসংগত নয়। কারণ, ভারতে স্টারলিংকের স্যাটেলাইট বিম বন্ধ রয়েছে। ফলে কোনো স্টারলিংক যন্ত্রই সেখানে সংযোগ পাওয়ার কথা নয়।

ভারতে বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা চালুর চেষ্টা করছে স্টারলিংক। এর মধ্যেই মাস্কের এই মন্তব্য এলো। এর আগে ভারত নিয়ে স্টারলিংকের পরিকল্পনা নিয়েও কথা বলেছেন মাস্ক। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, ‘কয়েকজন অলিগার্ক’ ভারতে স্টারলিংকের সেবা চালু হতে বাধা দিচ্ছেন।

ডজডিজাইনারের একটি পোস্টের জবাবে মাস্ক বলেন, ‘ভারতীয় জনগণের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে কিছু অলিগার্ক আমাদের (স্টারলিংক) আটকে দিচ্ছেন। তারা কারা, তা আপনারা অনুমান করতে পারেন… এটি ভারতের জনগণের বিরুদ্ধে অপরাধ।’

ডজডিজাইনারের ওই পোস্টে বলা হয়, ভারতের প্রত্যন্ত অনেক এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত ইন্টারনেট সেবা নেই। এসব এলাকায় ফাইবার বা মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌঁছানো কঠিন। তাই স্টারলিংক সেখানে উচ্চগতির ইন্টারনেট দিতে পারে। পোস্টে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ভারতের ১১ হাজার ২৫৬টি তালিকাভুক্ত গ্রামে চতুর্থ প্রজন্মের (৪জি) মোবাইল নেটওয়ার্ক ছিল না।

এতে আরো বলা হয়, ২০২৬ সালের মার্চে ভারতে মোট ইন্টারনেট সংযোগ ছিল ১০৯ কোটি ৩০ লাখ। এর মধ্যে গ্রামাঞ্চলে ছিল ৪৪ কোটি ৮ লাখ ৭০ হাজার সংযোগ। গ্রামাঞ্চলে প্রতি ১০০ জনের বিপরীতে ইন্টারনেট সংযোগের সংখ্যা ছিল ৪৮ দশমিক ৩১। শহরাঞ্চলে এই সংখ্যা ছিল ১২৬ দশমিক ৮০।

ওই সময় ভারতের মোট ইন্টারনেট সংযোগের মাত্র ৪ দশমিক ২৬ শতাংশ ছিল তারযুক্ত সংযোগ। তাই পর্যাপ্ত সেবা নেই—এমন এলাকায় স্টারলিংক উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড পৌঁছানোর আরেকটি সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে পোস্টে বলা হয়।

স্টারলিংকের স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রত্যন্ত গ্রাম, পাহাড় ও দ্বীপ এলাকায় ইন্টারনেট দেওয়া সম্ভব। এসব জায়গায় ফাইবার বা মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌঁছানো কঠিন। ভালো ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে গ্রামাঞ্চলের স্কুলগুলো অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে পারবে। ক্লিনিকগুলো দূর থেকে চিকিৎসা পরামর্শ দিতে পারবে। ছোট ব্যবসাগুলোও আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারবে।

দুর্যোগের সময়ও স্টারলিংকের সেবা কাজে লাগতে পারে বলে পোস্টে বলা হয়। বন্যা, ভূমিকম্প বা ঝড়ে স্থলভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বহনযোগ্য স্টারলিংক টার্মিনাল জরুরি সেবাদানকারী দলগুলোকে বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা দিতে পারে।

স্টারলিংকের সরাসরি মোবাইল সংযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে সাধারণ ৪জি ফোনও মোবাইল টাওয়ারের আওতার বাইরে সংযোগ পেতে পারে। তবে এ জন্য ভারতের অনুমোদন এবং মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে অংশীদারত্ব প্রয়োজন। ভারত সরকারও দুর্গম এলাকা, কম বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাকে ইন্টারনেট সংযোগের ঘাটতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বলে পোস্টে উল্লেখ করা হয়।

বাণিজ্যিক সেবা চালু করতে স্টারলিংকের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও স্পেকট্রাম বরাদ্দের প্রক্রিয়া শেষ করার আহ্বানও জানানো হয়।

এতে বলা হয়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ১০০ শতাংশ সংযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্য বাস্তবায়নে স্টারলিংক সহায়তা করতে প্রস্তুত। ভারতের সবচেয়ে দুর্গম এলাকার মানুষও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট পাওয়ার অধিকার রাখে।

৭ অক্টোবর ভারতের মোবাইল কংগ্রেস ২০২৬-এ বক্তব্য দেন স্টারলিংকের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ভাইস প্রেসিডেন্ট লরেন ড্রেয়ার। তিনি বলেন, ভারতের নিরাপত্তা ও অন্যান্য নিয়মকানুন মেনে স্টারলিংক দেশটির জন্য বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরি করেছে। ভারতে ২০টি গেটওয়ে সাইটও তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

ড্রেয়ার বলেন, ‘ভারতের নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা এবং অন্যান্য নিয়মকানুন বিবেচনায় নিয়ে আমরা ভারতের জন্য বিশেষভাবে আমাদের স্টারলিংক কার্যক্রম তৈরি করেছি। প্রতিটি স্তরেই ভারতের জন্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ভারতীয় ব্যবহারকারীদের তথ্যও ভারতের মধ্যেই রাখা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে বিনিয়োগ করেছি এবং প্রয়োজনীয় স্থলভিত্তিক অবকাঠামো তৈরি করেছি। ২০টি গেটওয়ে সাইটে শত শত অ্যান্টেনা রয়েছে। ভারতকে সেবা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রমও আমরা প্রস্তুত করেছি।’

ভারতের ডিজিটাল খাতে অগ্রগতির প্রশংসা করে ড্রেয়ার বলেন, ‘ডিজিটাল ক্ষেত্রে ভারত যা অর্জন করেছে, তা অসাধারণ।’ তিনি জানান, গত পাঁচ বছর ধরে ভারতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা, শিল্প খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে কাজ করছে স্টারলিংক। ভারতের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেদের কার্যক্রম সাজাতেই তারা এভাবে কাজ করছে।

ড্রেয়ার বলেন, পুরো ভারতে ১০০ শতাংশ সংযোগ নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী মোদির লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়তা করতে স্টারলিংক প্রস্তুত। প্রত্যন্ত এলাকার শ্রেণিকক্ষকে ইন্টারনেটের আওতায় আনা, টেলিমেডিসিন সেবায় সহায়তা এবং দুর্যোগের পর যোগাযোগব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে স্টারলিংকের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

ড্রেয়ার বলেন, ‘স্টারলিংকের মাধ্যমে মানুষ কয়েক বছরের মধ্যে নয়, কয়েক মিনিটের মধ্যেই সংযুক্ত হতে পারে।’ এ বছরের জুনে ভূ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে ভারত স্টারলিংকের অনুমোদন প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে-এমন খবরও নাকচ করেন ড্রেয়ার। তিনি বলেন, বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা চালুর বিষয়ে স্টারলিংক এখনো ভারত সরকারের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে আলোচনা করছে।

সূত্র: এএনআই নিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights