হুতিদের ঠেকাতে সৌদিতে ঢুকল পাকিস্তানি সেনা, সামনে নতুন সমীকরণ

অনলাইন ডেস্ক
সৌদি আরবে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দেশটির সামরিক মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী। সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র আওতায় পাকিস্তানি সেনারা সৌদি আরবে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করছে বলে জানিয়েছেন তিনি। আরব নিউজের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আহমেদ শরীফ চৌধুরী বলেন, ‘পাকিস্তানি বাহিনী ইতোমধ্যেই সৌদি আরবে অবস্থান করছে।’ তবে সৌদি আরবে পাকিস্তানি সামরিক সদস্যদের উপস্থিতি নতুন কোনো বিষয় নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষ্য, কয়েক দশক ধরেই পাকিস্তানি সেনারা সৌদি আরবে বিভিন্ন ভূমিকায় দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলার বিষয় নিয়ে রিয়াদে মক্কা অ্যালায়েন্স ফর ডিফেন্সের কৌশলগত, রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এর কয়েক দিন পর পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক ত্রিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় নির্দিষ্ট বাহিনী ও সামরিক সক্ষমতা সরবরাহে সম্মত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতেই সৌদি আরবে পাকিস্তানি বাহিনীর মোতায়েনের বিষয়টি প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেন পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্র।

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে কেন্দ্র করে সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। এসব হামলায় দেশটির বেসামরিক স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এই পরিস্থিতিতে গত ৫ অক্টোবর রিয়াদে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠক হয়। বৈঠকে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের হামলা বা হুমকি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেন তিন দেশের কর্মকর্তারা।

এর আগে গত ৭ আগস্ট ২০২৬ সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটি সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরবের নিরাপত্তা এবং তিন দেশের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ একটি নতুন ত্রিপক্ষীয় ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে সৌদি আরবকে কেন্দ্র করে নতুন সমীকরণের মুখে হুতি বিদ্রোহীরা।

দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে পাকিস্তান। এর মধ্যে সৌদি সামরিক সদস্যদের প্রশিক্ষণ এবং সামরিক উপদেষ্টা পাঠানোর বিষয়ও রয়েছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকটে সৌদি আরবও দেশটিকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে।

এই সামরিক সহযোগিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে গত বছরের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান পৃথক একটি দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। রয়টার্সের গত মে মাসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই চুক্তির আওতায় পাকিস্তান সৌদি আরবে ৮ হাজার সেনা, একটি স্কোয়াড্রন যুদ্ধবিমান এবং একটি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে।

লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী বলেন, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের বর্তমান ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আকস্মিকভাবে গড়ে ওঠেনি। দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কের ভিত্তিতেই তিন দেশের এই সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। পাশাপাশি তিন দেশের জনগণের মধ্যেও রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।’

পাকিস্তানি সামরিক মুখপাত্র আরও বলেন, ‘পাকিস্তানি বাহিনী বিভিন্ন সক্ষমতা ও ক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই সৌদি আরবে অবস্থান করছে।’

এদিকে রয়টার্স বুধবার দুই কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবকে সহায়তা করতে তুরস্কও দেশটিতে মূলত প্রতিরক্ষামূলক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পাঠাচ্ছে।

ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী এবং শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্পের অধিকারী তুরস্ক হুতিদের হামলার নিন্দা জানিয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে সমন্বয় করে সৌদি আরবের নিরাপত্তায় সহযোগিতার কথা জানিয়েছে দেশটি। লোহিত সাগরে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি নেতৃত্বাধীন একটি জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়েও তুরস্ক সম্মত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights