এআই নিয়ে মোদির উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ভারতীয়দের ‘না’
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারতের মুম্বাইয়ের ২১ তলা অ্যাপার্টমেন্টের জানালা দিয়ে তাকালে এখন আর সবুজ বনভূমির মনোমুগ্ধকর দৃশ্য চোখে পড়ে না। প্রকৌশলী তুষার শেঠির চোখের সামনে এখন শুধুই লাল মাটির ক্ষত। অ্যামাজনের একটি বিশাল ডেটা সেন্টারের পথ সুগম করতে কেটে ফেলা হয়েছে অসংখ্য গাছগাছালি। ভারতে ২০৩০ সালের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অবকাঠামো খাতে প্রায় ২,১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের অংশ হিসেবে গড়ে উঠছে এই সুবিধাটি।
পাঁচ মাস আগে কেনা নিজের ফ্ল্যাটে দাঁড়িয়ে ক্ষোভের সঙ্গে তুষার শেঠি জানান, যদি তিনি আগে থেকে জানতেন যে এখানে প্রকৃতির বুক চিরে এমন শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে, তবে তিনি কখনোই এই বাড়ি কিনতেন না।
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যে অভূতপূর্ব জোয়ার এসেছে, তাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে নিরবচ্ছিন্ন ডেটা সেন্টার নির্মাণের উন্মাদনা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া থেকে শুরু করে নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম কিংবা আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনের শহরতলি পর্যন্ত মানুষ এখন এআই ডেটা সেন্টারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামছে। তীব্র শব্দদূষণ, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচ, জলসংকট এবং আবাসিক এলাকাগুলোর শিল্পায়নের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ফুঁসে উঠছে বিশ্বজুড়ে। আন্তর্জাতিক এই জনরোষের হাওয়া এখন ভারতেও লাগতে শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘সমগ্র বিশ্বের ডেটা ভারতে ধারণ করার’ উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতে অ্যামাজন, গুগল এবং মাইক্রোসফটের মতো টেক জায়ান্টরা কোটি কোটি ডলার ঢালছে। পশ্চিম ভারতের মহারাষ্ট্র থেকে শুরু করে দক্ষিণের অন্ধ্রপ্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে এই প্রযুক্তি সাম্রাজ্য।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে বিশ্বমানের এআই মডেল তৈরিতে সরাসরি টেক্কা দেওয়া ভারতের পক্ষে আপাতদৃষ্টিতে কঠিন হলেও, দেশীয় কৌশলবিদরা মনে করছেন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ভৌত অবকাঠামো বা ব্যাকবোন নিয়ন্ত্রণে নিতে পারলে বিশ্বমঞ্চে সমপরিমাণ গুরুত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব। বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজেদের পুরোনো ব্যাক-অফিস ভাবমূর্তি মুছে মোদি যখন নতুন এই বিনিয়োগ বার্তা সামনে আনছেন, ঠিক তখনই তা স্থানীয় বাসিন্দা ও সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে তীব্র সংঘাত তৈরি করছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সমগ্র বিশ্বের ১৮ শতাংশ মানুষের আবাসস্থল ভারতে মিষ্টি পানির পরিমাণ মাত্র ৪ শতাংশ। আর নতুন ডেটা সেন্টারগুলো গড়ে উঠছে এমন সব শহরে, যেগুলো ইতিমধ্যেই তীব্র পানিসংকটে ভুগছে। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান মর্ডোর ইন্টেলিজেন্সের তথ্যমতে, ২০২৫ সালেই ভারতীয় ডেটা সেন্টারগুলো প্রায় ১৫০ বিলিয়ন লিটার পানি ব্যবহার করেছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের ধারণা অনুযায়ী, চলতি দশকে ভারতের প্রায় ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ ডেটা সেন্টার মারাত্মক জলসংকটের সম্মুখীন হতে পারে।
এই সংঘাতের সবচেয়ে প্রখর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে মুম্বাইয়ে অ্যামাজনের ৫৪ একর জমিতে প্রস্তাবিত প্রজেক্টটি। স্থানীয় কয়েক ডজন বাসিন্দা এবং অফিশিয়াল চিঠিপত্র পর্যালোচনা করে জানা গেছে, প্রকল্পটি এলাকার স্বাভাবিক বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহে বড় ধাক্কা দেবে। এতে সৃষ্ট বিকট শব্দ ছোট শিশু ও বৃদ্ধদের স্বাস্থ্যের মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে। এই আশঙ্কায় এলাকাটিতে বিশাল গণবিক্ষোভ গড়ে উঠেছে এবং সাধারণ মানুষের সাথে কণ্ঠ মিলিয়েছেন রাজনৈতিক দলের নেতারাও।
সম্প্রতি মুম্বাইয়ের প্রকল্প এলাকার কাছে শত শত সাধারণ মানুষ ও প্রবীণ নাগরিক ব্যানার হাতে প্রতিবাদ সমাবেশে অংশ নেন। সেখানে তাদের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল—‘ডেটা সেন্টারগুলো হলো শক্তির চোষক’। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ডেটা সেন্টারটি অন্য কোথাও সরিয়ে নিতে হবে।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা বসুধা শেঠি আক্ষেপ করে বলেন, জীবনের শেষভাগে এসে শান্তিতে অবসরের আশায় তিনি ফ্ল্যাটটি কিনেছিলেন, কিন্তু এখন ডেটা সেন্টার চালুর সম্ভাবনা দেখে বাধ্য হয়েই অন্যত্র চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন।
স্থানীয় ১,০০০ এরও বেশি বাসিন্দার অভিযোগ, তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের পূর্ব আলোচনা ছাড়াই প্রশাসন জোর করে এই প্রকল্প চাপিয়ে দিচ্ছে। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় জনরোষ ও স্থানীয় উদ্বেগের মুখে অ্যামাজন তাদের তিনটি সেন্টারের পরিকল্পনা স্থগিত করে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলোচনায় সময় দিয়েছিল। মুম্বাইয়ের বাসিন্দারা সেই সুযোগটুকুও পায়নি। পরিস্থিতি সামাল দিতে ভেতরে ভেতরে সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচির ছক কষলেও অ্যামাজন জানিয়েছে, এই প্রকল্পে পরিবেশবান্ধব ওয়াটার-ফ্রি কুলিং সিস্টেম এবং পৃথক পাওয়ার গ্রিড ব্যবহার করা হবে যাতে সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব না পড়ে। এমনকি কাটা পড়া গাছের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দ্বিগুণ চারা রোপণের দাবি করেছে তারা। তবু এই শিল্পের ভেতরের অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা আবাসিক এলাকার পাশে ডেটা সেন্টার স্থাপনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সিফি ইনফিনিট স্পেসেসের সিইও শরদ আগারওয়াল স্পষ্ট জানান, তিনি কখনোই আবাসিক এলাকায় ডেটা সেন্টার স্থাপন করবেন না, কারণ সংকটের সময় এরা বসতবাড়ির বিদ্যুৎ ও পানি দুটোই শুষে নেয়।
শুধু অ্যামাজনই নয়, ভারতে প্রায় ২,০৫০ কোটি ডলারের বিশাল বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে মাইক্রোসফট, যার সিংহভাগই যাবে এআই ডেটা সেন্টারে। অন্যদিকে, অন্ধ্রপ্রদেশে গুগলের ১,৫০০ কোটি ডলারের প্রকল্পটির বিরুদ্ধেও পরিবেশবাদীরা জলবায়ু ঝুঁকি, বন্যপ্রাণীর ক্ষতি এবং মন্দিরের জমি অন্যায়ভাবে দখলের অভিযোগ এনে রাস্তায় নেমেছেন। আন্দোলন এখন দ্রুত রাজনৈতিক রূপ ধারণ করছে। মহারাষ্ট্রের বিরোধীদলীয় নেতা আদিত্য ঠাকরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ক্ষমতায় ফিরলে তারা জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে এই প্রকল্প সরিয়ে দেবেন। ডেটা সেন্টারের আগমনে এলাকার প্রোপার্টি ভ্যালু ও রিসেল প্রাইস আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় প্রোপার্টি ব্রোকাররাও।
তিন দশক ধরে মুম্বাইয়ের ওই এলাকায় বাস করা বিদ্যা কদমের মতো হাজারো মানুষ এখন পণ করেছেন, নিজেদের জীবনযাত্রা ও পরিবেশ রক্ষায় যা যা করা দরকার তারা রাজপথে নেমে ঠিক তা-ই করবেন।
সূত্র: রয়টার্স
